আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের পুরস্কার (২য় পর্ব) – দোয়া করার আদব

পবিত্র কোরআন শরীফের এবং নবীজি (সঃ) এর সুন্নতের অধিকাংশ দুআতে, আপনি খুব সাধারন একটি ব্যাপার খেয়াল করবেন যে, কোন না কোনভাবে আপনি আল্লাহর কাছে নিজের জন্য আরও বেশি শক্তি, সামর্থ্য প্রার্থনা করছেন। আপনি আল্লাহর কাছে পথ প্রদর্শন, ক্ষমাশীলতা এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার দোয়া করছেন। أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ – সূরা আন নামল, আয়াত ১৯। আমাকে ক্ষমতা প্রদান করুন যাতে আমি আপনার নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। আমি আপনাদের একটি উদাহরণ দিব যা দ্বারা আপনাদের বুঝতে সহায়ক হবে যে আমি কি বুঝাতে চাই। যেমন ধরুন, একজন মানুষ সমুদ্রে ছিল এবং তাদের জাহাজের সাথে পাথরের সংঘর্ষ হয়ে জাহাজটি ডুবে গেলো। তিনি একটি কাঠের টুকরায় সমুদ্রে ভেসে আছেন। এবং আল্লাহর কাছে দুআ করছেন। এমতাবস্থায় আল্লাহর কাছে তিনি দুই ভাবে দুআ় করতে পারেন। ‘হে আল্লাহ আমাকে এখনই একটি দ্বীপে স্থানান্তর করুন এবং এই ঝড় বৃষ্টি বন্ধ করে দিন।’ অথবা আপনি চাইতে পারেন ‘হে আল্লাহ আমাকে এই কঠিন সময় মোকাবেলা করার শক্তি দিন। এখন তিনি দুআ করলেন, আমাকে এখনই একটি হেলিকপ্টার পাঠান, এবং আমাকে একটি দ্বীপে নিয়ে যান। এবং তিনি হেলিকপ্টারের জন্য দুআ করতে থাকলেন। কিন্তু কোন হেলিকপ্টার আসলো না। তিনি বললেন, ”আল্লাহ আমাকে হেলিকপ্টারও পাঠালেন না। আমি তো অনেক দুআ করলাম। এইটা ঠিক না। বাদ দাও আমি আর দুআ করব না।” অথবা মনে করুন, উনি দুআ করছেন সমুদ্র শুকিয়ে সমতলভূমি হয়ে যাক। বলছেন হে আল্লাহ, আপনার তো সেই ক্ষমতা আছে যেকোনো অবস্থা পরিবর্তনের। আপনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা, সুতরাং আপনি এই সমুদ্রকে সমতলভূমিতে পরিণত করতেই পারেন। আপনি যেহেতু ইব্রাহিম (আঃ) কে নিক্ষেপ করা আগুন ঠান্ডা করে দিয়েছিলেন, সুতরাং আপনি আমার জন্যও এটা করতে পারেন। কিন্তু তারপরও সেটা ভূমিতে পরিণত হয় না, সমুদ্রই থেকে যায় এবং লোকটি ধীরে ধীরে ডুবে...

কেন আমরা ঈদ উদযাপন করছি?

আজ আমরা কী উদযাপন করছি? প্রতি বছর আল্লাহ আজ্জা ওয়া জ্বাল আমাদেরকে এভাবে একত্রিত করেন, দুই ঈদে- একটি হলো ঈদুল ফিতর আর এটি হলো ঈদুল আযহা। আর এই উভয় অনুষ্ঠানেই প্রতি বছর আমাদের একই বিষয় মনে করার কথা এবং একই বিষয়ের উপর চিন্তা-ভাবনা করার কথা। এটা নিশ্চয় এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের গোটা উম্মাহ তথা পৃথিবীর জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশের প্রতি বছর এই ঐতিহ্য – আমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ) এর ঐটিহ্য – নিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। আর এটি আসলেই একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই পৃথিবীর সকল সভ্যতারই কোন না কোন উৎসব রয়েছে। যেমন, বিভিন্ন জাতির স্বাধীনতা দিবস, সাংস্কৃতিক দিবস বা অন্য কোন উৎসবের দিবস। বাস্তবিকপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের অতিরিক্ত বেশী উৎসবের দিন রয়েছে। এক সপ্তাহ পর পরই কোন না কোন ছুটির দিন এসে উপস্থিত হয়, যেমন শ্রমিক দিবস, মেমোরিয়াল দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা অন্য কোন ধরণের দিবস। এমনকি প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেও আমরা বিভিন্ন উৎসব বা ধর্মানুষ্ঠানের সন্ধান পাই। যেখানে পুরো জাতি একত্রিত হয়ে বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করে। সকল সভ্যতাতেই এই ধর্মানুষ্ঠানগুলোতে মানুষ একত্রিত হয়, সুখী সময় কাটায়। সাধারণত এই অনুষ্ঠানগুলোর প্রত্যেকটিই কোন ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ইতিহাস জুড়ে এটাই জাতিগুলোর প্রকৃতি। মানুষের উদযাপিত এই উৎসবগুলো বড় কোন ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট যা সেই জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ। আর সেই হিসেবে আমাদের দীনের ক্ষেত্রে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জ্বাল আমাদেরকে বিক্ষিপ্ত কোন দিবস দেয়ার পরিবর্তে এই দুইটি ঈদ দান করেছেন। আর এই দুই দিন মুহাম্মাদ (স) এর গোটা উম্মাহ একসাথে উদযাপন করে। সারা পৃথিবীজুড়ে, সকল ভাষাভাষী মানুষ, সকল সংস্কৃতির মানুষ…আমরা একত্রিত হই এবং একসাথে উদযাপন করি। আর অবশ্যই এই সময়ে আমরা উত্তম পোশাক পরিধান করি, ভালো খাবার খাই, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাই এবং এই ধরণের আরও সুন্দর সুন্দর কাজ করি। কিন্তু ঠিক একই সময়ে আমাদের এটা স্মরণ...

আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ

আল্লাহ আপনার অন্তরে ঈমানকে সুন্দর করেছেন। আল্লাহ ঈমানকে আপনার কাছে প্রিয় করেছেন এবং তিনি একে আপনার হৃদয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছেন। তবে এটা দ্বারা কী বোঝায়? এটা দ্বারা বোঝায়, রাসূল (সাঃ)-এর জন্য আমাদের যে ভালোবাসা রয়েছে, যা আমরা আমাদের হৃদয়ে বহন করি তা সুন্দর। যখন আপনার হৃদয়ে সুন্দর কিছু থাকে, এক সময় এই সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ধারক তাই প্রকাশ করে যা এটা ধারণ করে। সুতরাং যখন কারো অন্তরে রাসূল (সাঃ)-এর জন্য ভালোবাসা থাকে তখন তার বহিঃপ্রকাশ কীভাবে ঘটে? একটা ব্যাপার যা ঘটে তা হচ্ছে, যার অন্তরে রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ (সাঃ) আছেন আমার হৃদয়ও তাদের প্রতি কোমল হয়ে যায়। এটার একমাত্র কারণ হচ্ছে, আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে এতো ভালোবাসি যে, যার আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর প্রতি ভালোবাসা রয়েছে, তার জন্য আমারও ভালোবাসা রয়েছে। এটাই মূলত রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি আমার ভালবাসার প্রমাণ। তাই যখন একজন মুসলিম অন্য একজন মুসলিমকে নিয়ে ঠাট্টা করার সময় দ্বিতীয়বার চিন্তা করে না, তখন বুঝতে হবে আল্লাহর রাসূল (সঃ) এর প্রতি ভালোবাসায় তার কিছু একটা ঘাটতি রয়েছে। সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ (সঃ) সকলকে একইভাবে ভালবাসতেন। আপনাদের এ ব্যাপারটি সহজে বোঝাবার জন্য একটি ভিন্ন উদাহরণ দেওয়া যাক। অনেকেই এমন আছেন যাদের পিতামাতা মারা গেছেন এবং যখন বাবা-মা মারা যান, এটা একটা কষ্টকর ব্যাপার। আপনি তার সঙ্গ চান, আপনি আপনার পিতার অভাব বোধ করেন, তাকে স্মরণ করতে চান, আপনি জানেন কী করতে হবে? আপনি তার কিছু বন্ধুকে দেখতে যান। আপনার পিতার স্মরণে তার বন্ধুদের দেখতে যাওয়া, তাদেরকে সম্মান দেখানো…এ কাজগুলোই এখন আপনার নিকট একান্ত প্রিয় কাজ। আমার বাবা এই লোকগুলোকে ভালবাসতেন, তাই আমি তাদের ভালোবাসি। এই লোকগুলোর সঙ্গ আমাকে এমন ব্যক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যাকে আমি ভালোবাসি কিন্তু যাকে আমি এখন আর দেখতে পাই না। আপনার এবং আমার মধ্যেকার পারস্পারিক সম্পর্কটাও ঠিক এমনই।...

হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রা) এর তোতলামি

মহানবী (সঃ) …খুবই স্পর্শকাতর ঘটনা। তাঁর নাতি, আলী এবং ফাতিমা (রা) এর সন্তান ছিলেন হুসাইন (রা)। দুই ভাইয়ের মাঝে তিনি ছিলেন ছোটজন, হাসান এবং হুসাইন, আল্লাহ তাঁদের উভয়ের উপর সন্তুষ্ট হোন। ছোট ভাই তোতলাতেন। তাঁর এত বেশি তোতলামি ছিল যে তিনি একটি বাক্যও শেষ করতে পারতেন না। একটি বাক্য শেষ করতে তাঁর অনেক সময় লাগতো। তাঁর উপর একজন ছোট শিশু হিসেবে … একে তো একটা শিশুর বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে এটা খুবই কষ্টদায়ক এবং বেদনাদায়ক ছিল, তার উপর তাঁর বড় ভাই হাসান (রা) ছিলেন অসাধারণ বাগ্মী, সুভাষী এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ গুণের অধিকারী বক্তা। তো, চিন্তা করুন ছোট ভাই কেমন চাপ অনুভব করতেন যিনি এতো বেশি তোতলাতেন! যাইহোক তিনি অনেক বেশি তোতলাতেন। আমরা জানি, বাচ্চারা যখন একটু বড় হতে শুরু করে, ৪ বা ৫ বছর বয়সের সময় তারা যখন কিছুটা সাহস অর্জন করে এবং সে সময় তারা অনেক কথা বলতে পছন্দ করে। একদিন মহানবী (স) কিছু সাহাবীর সাথে বসে ছিলেন, আর তাঁর দুই নাতিও তাঁর সাথে বসে আছেন। তখন ছোটজন যে তোতলাতো সে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল। কারণ তারা তাঁদের নানাকে ভালোবাসতো। তারা তাঁর সাথে অনেক কথা বলতো। তো, সে কিছু বলার চেষ্টা করছিল… আর রাসূলুল্লাহ (স) সবাইকে এতো বেশি সম্মান করতেন যে কেউ যদি কিছু বলা শুরু করতো তিনি চুপ করে থাকতেন, তিনি সেই ব্যক্তির দিকে শুধু তাঁর চেহারাই ফেরাতেন না, তিনি তাঁর বক্ষ সমেত তার দিকে ফিরতেন, এবং বক্তার কথা বলার সময় বক্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। আচ্ছা তারপর, হুসাইন (রা) কথা বলা শুরু করলেন, আর রাসূলুল্লাহ (স) থেমে গেলেন এবং তার দিকে ফিরলেন। ফলে সেখানকার অন্য সবাইও তার কথা শুনতে লাগলেন। কিন্তু শিশুটি এতো বেশি তোতলানো শুরু করলেন যে পরিস্থিতি কিছুটা বেমানান হয়ে উঠলো। তাই কিছু মানুষ...

সত্য প্রত্যাখ্যানের কৌশল

সত্য-মিথ্যার চিরকালীন দ্বন্দ্বে মিথ্যাবাদীরা কৌশল খাটিয়ে কিছুদিনের জন্য টিকতে পারে – তা নিয়ে এক খুৎবাতে উস্তাদ নুমান আলী খান কুর’আন হাদীস থেকে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাদের ৫টি কৌশলের। মিথ্যাবাদীদের কৌশলগুলো বলার আগে দেখি আল্লাহ সুবহানাল্লাহি ও তাআলা সত্যকে কীভাবে চিত্রায়িত করেছেন কুরআনে। সত্য সবসময় আগ্রাসী আর মিথ্যাকে সামনে পেলেই চুরমার করে ফেলে: “আমরা সত্যের দ্বারা মিথ্যার উপর আঘাত হানি, ফলে তার মগজ চুরমার হয়ে যায়, তখন দেখো! তা অন্তর্হিত হয়। আর ধিক তোমাদের প্রতি! তোমরা যা আরোপ কর সেজন্য।“ [সূরা আম্বিয়া: ১৭] সত্যের নিজের কোন অস্ত্র লাগেনা। মিথ্যাকে মারার জন্য সত্য নিজেই এক অস্ত্র। কোন বিষয়ের সত্য মিথ্যা একসাথে রাখলে সত্য একদম নিঃশেষ করে দেয় মিথ্যা কে। সত্য খুবই আগ্রাসী এ ব্যাপারে। সত্যের আগমনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই হয় যারা এতদিন মিথ্যা কিছু তথ্য আর বিশ্বাসের উপর ভর করে বিশাল বিশাল ইমারত তৈরি করে নিয়েছে আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম অন্ধভাবে তা মেনে চলছে। এইসব অহংকারী মিথ্যাবাদীরা কিভাবে সত্যকে নিশ্চিতভাবে জানার পরও প্রথম যে কৌশল এর আশ্রয় নেয় তা হল By Force বা পেশী শক্তি আর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে। যেমন: ছোট একটা ছেলে তার এক বড় ভাইকে বিরবির করে বলল: ২+২=৪ বড়ভাই বলে উঠল ভারী গলায় “না, ২+২ =৫” “কিন্তুদেখুন ২ হচ্ছে ১ যোগ ১ আর…” “থাম, আমি বলছি ৫ , তাই ৫ এখন অফ যাও” ইব্রাহীম (আঃ) যখন তার গোত্রদের বললেন তোমরা ভুল ইলাহদের প্রার্থনা করছো আর জবাবে ওরা বলল: তাই না? ওকে জীবন্ত পুড়াও। শুধু জোর খাটিয়ে পেশী শক্তি আর হুংকার দিয়ে সত্যকে দূরে ঠেলে দেয়। দ্বিতীয় কৌশল হল চরিত্র হনন। আগের উদাহরণে আসি। – “জান ভাইয়া ২+২=৪” – “তাই না? তুমি তো বাইট্টা, ঠিকমত হাটতেও পারোনা আর আমারে আইসো শিখাইতে, না?” মুসা (আঃ) যখন সত্যের দাওয়াত নিয়ে আসলেন তখন...