কেমন করে তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে কুফরী অবলম্বন করছ? অথচ তোমরা ছিলে মৃত। (বাকারা – ২৮)

কেমন করে তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে কুফরী অবলম্বন করছ? অথচ তোমরা ছিলে মৃত। (বাকারা – ২৮) এই আয়াতটি খুবই গভীর দার্শনিক অর্থ বহন করে। এই আয়াত সম্পর্কে অনেক কিছু বলা হয়েছে। যে মতামতগুলো আমার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে সেগুলো এখন আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। আমি মরহুম ইসরার আহমেদের কাছে কৃতজ্ঞ। এই আয়াত থেকে সবচেয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি আমি তার কাছ থেকেই পেয়েছি। তিনি ১৯৮৫ সালে এই আয়াত নিয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন। ভারত পাকিস্তানের বহু আলেম তার এই প্রবন্ধের প্রশংসা করেন। আমি এখন আপনাদের নিকট তার একটি সারমর্ম তুলে ধরবো। কারণ আমি মনে করি এটি অনেক মূল্যবান। আল্লাহ আজ্জা বলেন, كَيْفَ تَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَكُنتُمْ أَمْوَاتًا – কেমন করে তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে কুফরী অবলম্বন করছ? অথচ তোমরা ছিলে মৃত। প্রথম পর্যায় – وَكُنتُمْ أَمْوَاتًا তোমরা মৃত ছিলে। দ্বিতীয় পর্যায় – فَأَحْيَاكُمْ অতঃপর তিনি তোমাদের জীবন দান করেছেন। ৩য় পর্যায় – ثُمَّ يُمِيتُكُمْ তারপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দান করবেন; ৪র্থ পর্যায় – ثُمَّ يُحْيِيكُمْ তারপর তিনি তোমাদের আবার জীবিত করবেন। প্রথম পর্যায়টা কী ছিল? তোমরা মৃত ছিলে। আমাদেরকে প্রথম যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হলো – মৃত আর অস্তিত্ব না থাকা একই বিষয় নয়। যেমন, মৃত কাউকে কফিনে রাখা হয়েছে এবং তার জানাজা হচ্ছে – এর মানে এই নয় যে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রকৃতপক্ষে, পৃথিবীর যে কোনো ভাষায় মৃত বলতে এমন কাউকে বোঝায় যার পূর্বে জীবন ছিল। সুতরাং এই আয়াতে মনে হয় যেন একটি ইঙ্গিত রয়েছে…(আমরা একটু পর আবার এ বিষয়ে আলোচনা করবো, তার পূর্বে কিছু বিষয় বুঝে নেয়া জরুরি) কুরআন এবং রাসূল (স) এর সুন্নায় – মৃত্যুকে ঘুমের কাছাকাছি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মৃত্যু এবং ঘুম একে অন্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ঘুমাতে যাওয়ার সময় আমরা কী পড়ি? ‘আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমূতু...

মৃত্যুর পর যে আরেকটি জীবন আছে তার প্রমান কী?

কুরআনের অন্যতম একটি প্রধান থিম, আক্ষরিকভাবে কুরআনের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মৃত্যুর পরের জীবনের কথা উল্লেখ করেছেন। এটি আমাদের ধর্মের অন্যতম একটি মৌলিক স্তম্ভ। এটি অন্যতম একটি প্রধান বিষয় যা রাসূল (স) কুরাইশদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কারণ কুরাইশরা বিশ্বাস করতো না যে, মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন রয়েছে। আর আল্লাহ এই বিষয়টি বিভিন্নভাবে মানুষকে বুঝিয়েছেন। যৌক্তিক প্রমানের মাধ্যমে – আল্লাহ বলেন – মৃত জমিনের দিকে তাকাও যাকে আমি পুনরায় জীবন দান করি। মৃত গাছের দিকে তাকাও, মরার পর সেগুলো আবার জীবন ফিরে পায়। শক্তিশালী সব সৃষ্টির দিকে তাকাও, তোমার নিজের জীবনের দিকে তাকাও। নিশ্চয়ই যিনি তোমাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন; তিনি তোমাকে পুনরায়ও সৃষ্টি করতে পারবেন। আল্লাহ যে প্রমাণগুলো ব্যবহার করেছেন সেগুলো নৈতিক প্রমান। আল্লাহ বলেন – তোমরা কি মনে করো আমি ধর্মভীরু এবং ধর্মহীনকে অথবা সৎ এবং অসৎ ব্যক্তিকে একই রকম প্রতিদান দিবো? এই পৃথিবীতে কখনো কখনো হাজার হাজার মানুষকে খুন করা ব্যক্তিও পার পেয়ে যায়। এই পৃথিবীতে চরম কোনো পাপিষ্ঠ ব্যক্তিকেও মাঝে মাঝে দেখা যায় উন্নত জীবন যাপন করতে। তারা নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতন করে, হত্যা করে। এখন যদি মৃত্যুর পর কোনো জীবন না থাকে, জান্নাত-জাহান্নাম না থাকে, তাহলে জীবনটা তো খুবই অন্যায্য হয়ে পড়ে। ন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণ করার তো আর কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন – তিনি ন্যায় বিচারক। তিনি সীমাহীন ন্যায়বিচারক। আর তাই বিচার দিবস অবশ্যই সত্য। সেই বিচার দিবসে মানুষকে তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হবে; আর হ্যাঁ, তাদের অন্যায় কাজের শাস্তি দেয়া হবে। আবারো বলছি কুরআনে পরকাল বিষয়ে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। কিন্তু দিনশেষে আপনাকে এটা বিশ্বাস করতে হবে। আমি আপনাদের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমান দিতে পারবো না। এমন কোনো ইকুয়েশন দিতে পারবো না যা প্রমান করবে যে মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন রয়েছে। কিন্তু...

জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার

আপনি কি জানেন, জান্নাতের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি কী হবে? আল্লাহ আমাদের সবাইকে জান্নাতে একত্রিত করবেন ইনশাআল্লাহ! এবং আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলবেন। কল্পনা করুন… সহীহ হাদিস ভাইয়েরা, আমি চাই আপনারা সত্যিকার অর্থেই ব্যাপারটা কল্পনা করুন কোনো হাসি ঠাট্টা নয়। জান্নাতে আল্লাহ্‌ আমাদের সকলকে একত্রিত করবেন এবং আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলবেন আমার ভাই ও বোনেরা, আল্লাহ আপনাদের জিজ্ঞাসা করবেন “তোমরা কি আর কিছু চাও? তোমাদের জন্য আর কী করতে পারি?” কল্পনা করুন, এই ভঙ্গিমায় আল্লাহ আপনার সাথে কথা বলছেন… কল্পনা করুন আল্লাহ আপনাকে ডেকে বলছেন, আমি কি তোমার জন্য আর কিছু করতে পারি? তখন আমরা বলব, “হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন, আমাদের জান্নাতে দাখিল করেছেন, আপনি আমাদের চিরদিনের জন্য জান্নাতে থাকার সুযোগ দিয়েছেন, আপনি আমাদের এতসব ভোগবিলাসের সামগ্রী প্রদান করেছেন হে আল্লাহ! আমাদের আর কিইবা চাওয়ার থাকতে পারে?” তখন আল্লাহ বলবেন, “তোমরা কি সন্তুষ্ট?” আমরা বলব, “হে আল্লাহ! আমরা এতটাই সন্তুষ্ট যে আমাদের আর কিছুই চাওয়ার নেই!” আল্লাহ বলবেন- “যদি তা-ই হয়ে থাকে আজকের দিন থেকে আমি কথা দিচ্ছি যে আজকের দিন থেকে, আমি আর কোনোদিন তোমাদের উপর অসন্তুষ্ট হবো না! (অর্থাৎ আমি চিরদিনের জন্য তোমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম!)”। এটা কল্পনা করুন ভাইয়েরা আমার…কল্পনা করুন, আল্লাহ আপনার উপর আর কক্ষনো রুষ্ট হবেন না! আপনি কি ভাবছেন এখানেই শেষ? ওয়াল্লাহি, এখানেই শেষ নয়! রাসূলুল্লাহ (সা.) সহীহ হাদিসে আমাদের জানিয়েছেন…আল্লাহ আমাদের একত্রিত করবেন আরেকবার এবং বলবেন, “হে আমার বান্দারা! তোমরা কি সুখী? তোমরা কি খুশি? তোমরা কি সন্তুষ্ট?” এবং আমরা উত্তর দিবো…”হে আল্লাহ! আমাদের আর কি চাওয়ার থাকতে পারে?” “হে আল্লাহ! আমরা যা চেয়েছি, আপনি তো আমাদের সবই দিয়েছেন! হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জান্নাত দিয়েছেন, আপনি আমাদের সকল ইচ্ছা পূরণ করেছেন। এবং আপনি আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে,...

আবু বকর (রা)

আমি আপনাদের ভাই ওমর সুলেইমান। সুপারস্টার সিরিজে স্বাগতম। ইনশা আল্লাহ, আজকে আমরা নবীদের পরে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে জানবো, আর তিনি হলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা)। আর এটা রাসূলের (স) নিজের করা একটি উক্তি থেকে প্রমাণীত। আবু বকরকে (রা) যদি লক্ষ্য করেন, আপনি দেখতে পাবেন যে তিনি যেন রাসূলের (স) অবিকল প্রতিচ্ছবি ছিলেন। তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন দানশীলতায়, তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন শালীনতায়, তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন নামাজ আদায়ে, তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন কুরআন তিলাওয়াতে, তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন সবকিছুতে। আর এ কারণেই আলী (রা) আবু বকর (রা) সম্পর্কে বলেছেন, ( كَانَ سَبَّاقََا لِكُلِّ خَيْرِِ ) । আপনি যে কোন ভাল কাজের কথাই চিন্তা করেন, আবু বকর (রা) ইতিমধ্যেই সেটা করে ফেলেছেন। কিন্তু যেটা আমাদের কাছে তাঁকে বিষ্ময়কর করে তোলে, তা হলো তিনি ছিলেন আস-সিদ্দীক। তিনি ছিলেন এমন ব্যক্তিত্ব, যার সত্যবাদীতার সাক্ষ্য রাসূল (স) নিজে দিয়েছিলেন। রাসূলের (স) সাক্ষ্য অনুযায়ী তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ মানুষ। কেন ? কারণ, যখনই তিনি বলেছেন যে তিনি কোন বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, যখনই তিনি বলেছেন যে তিনি রাসূলকে (স) বিশ্বাস করেন, তিনি হৃদয়ের গভীর থেকেই বলেছেন। তাঁর কথা এবং বাস্তবতর মাঝে যেমন সামঞ্জস্য ছিলো, তেমনি মিল ছিলো কথা এবং কাজে – যখনই তিনি বলেছেন তিনি আল্লাহ এবং রাসূলকে (স) ভালোবাসেন। একারণেই আমরা দেখতে পাই, যখন তাঁর বন্ধু রাসূল (স) তাঁর কাছে এসে বললেন, আমি আল্লাহর নবী, আবু বকর (রা) সেদিনই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং প্রভাবশালীদের মধ্যে অনেককেই ইসলামে নিয়ে আসলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন, তালহা, যুবাইর, উসমান (রা), আব্দুর রহমান ইবনে আউফ। তিনি ইসলামে নিয়ে আসলেন অর্ধেকেরও বেশী আশারা মুবাশশিরীন, যারা ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন সহাবী, যাদেরকে নিয়ে আমরা এই সিরিজে আলোচনা করছি। কিন্তু আজকে আসলেই যে বিষয়ে নজর দিতে চাই, তা হলো, রাসূলের (স)...

লোক দেখানো সৎকাজের পরিনাম এবং আত্মসমালোচনার গুরুত্ব

আল্লাহ প্রদত্ত একটি চমৎকার উপমার মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। আল্লাহ সূরা নূরের ৩৯ নাম্বার আয়াতে বলেন, وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَعْمَالُهُمْ كَسَرَابٍ بِقِيعَةٍ يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً ‘’যারা কাফের…’’, এর আরো একটি অনুবাদ করা যায় যারা গোপন করেছে, অর্থাৎ যারা তাদের আলোকে গোপন করেছে। আপনি কুফর শব্দটাকে এভাবেও চিন্তা করতে পারেন। যাইহোক – যারা অস্বীকার করেছে (অকৃতজ্ঞ, নিজেদের আলোকে গোপন করেছে) তাদের তাদের কর্ম সেই ব্যক্তির মত যে ভর দুপুরে কোন এক মরুভূমির মাঝ দিয়ে ভ্রমণ করছে তারপর সে হঠাৎ করে ‘সারাব’ দেখতে পায়। অর্থাৎ মরীচিকা দেখতে পায়। তো, সেই পুরুষ বা মহিলাটি পিপাসা কাতর, মরুভুমিতে হারিয়ে গেছে, জীবন বাঁচানোর জন্য কোন জায়গা খুঁজছে…। ভর দুপুরে তপ্ত রোদে মরুভূমিতে এভাবে হাঁটলে সামনের বালুকারাশিকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে সেখানে তো কোন সমুদ্রের ঢেউয়ের অস্তিত্ব নেই। দূর থেকে মনে হয় পানি দেখা যাচ্ছে। এটাকেই বলা হয় মরীচিকা। আপনি যেহেতু পিপাসায় মারা যাচ্ছেন, তাই ভাবেন অন্তত গিয়ে দেখি পানি পাই কিনা। يَحْسَبُهُ الظَّمْآنُ مَاءً – তাই পিপাসা কাতর ব্যক্তি সেই মরীচিকাকে পানি মনে করে তার দিকে দৌড়ে যায়। حَتَّىٰ إِذَا جَاءَهُ – এমনকি, সে যখন তার কাছে যায়, لَمْ يَجِدْهُ شَيْئًا – তখন ‘’সেখানে সে কিছুই পায় না।’’ এটা তো শুধু বালুই ছিল। এটা কেবল একটা মিথ্যা চিত্র ছিল। وَوَجَدَ اللَّهَ عِندَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ ۗ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ – ‘’এবং পায় সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’’ সে সেখানে শুধু আল্লাহ তায়ালাকে পায়। সেই লোকটি পানির খোঁজে সেখানে গিয়েছিল, কিন্তু এই উদাহরণের মাঝখানে আল্লাহ আশ্চর্যজনক একটি বাঁক নিয়েছেন। পানি পাওয়ার পরিবর্তে সেখানে সে তার প্রভুকে পায়। وَوَجَدَ اللَّهَ عِندَهُ فَوَفَّاهُ حِسَابَهُ ۗ وَاللَّهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ সে সেখানে আল্লাহকে পায় আর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দিবেন।...