নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাওয়া, ফিরে আসা

ক্ষমা চাওয়াটা দুইভাবে হয়ে থাকে। জিহ্বার মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্তরের মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া। মানুষ সাধারণত নিজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে থাকে। আমি যদি কোনো কারণে আপনার সমালোচনা করি যেমন আমি কাউকে বললাম – ”এই যে, আমি আপনাকে অমুক কথা বলতে শুনেছি। আপনি কেন এটা বলেছেন?” সে তৎক্ষণাৎ হয়তো বলে উঠবে – ”আমি এমনটা বোঝাতে চাই নি, আপনি জানেন না আমি কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি! আপনি তো পুরো ঘটনাটাই জানেন না।”

সুতরাং কেউ আপনাকে যদি বলে, ভাই আমি আপনাকে এটা এটা করতে দেখেছি। আপনি সাথে সাথে নিজের পক্ষে যুক্তি দিতে শুরু করেন, আত্মরক্ষামূলক হয়ে উঠেন। بَلِ الْإِنسَانُ عَلَىٰ نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ – وَلَوْ أَلْقَىٰ مَعَاذِيرَهُ – ﴾বরং মানুষ নিজেই তার নিজের কাজ সম্পর্কে নিজেই পূর্ণ অবগত। তবুও তারা প্রচুর অজুহাত দেখায়﴿ [সূরা কিয়ামাহঃ ১৪]। আপনি যদি আসলেই আল্লাহর ক্ষমা চান। আপনাকে নিরিবিলি একটা সময় খুঁজে নিতে হবে। যদি আরবীতে দো’আ করতে না পারেন কোনো সমস্যা নেই। আপনি শুধু পাঞ্জাবি, বাংলা, বাহাসা বা উর্দু জানেন, কোনো ব্যাপার না, আপনি আপনার নিজস্ব ভাষাতেই আল্লাহর সাথে কথা বলুন।

আন্তরিকতার সাথে আপনার অপরাধগুলো স্বীকার করে নিন। কোনো অজুহাত দেখাবেন না। এইরকম করতে পারা আসলেই অনেক কঠিন। কারণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও আমরা নিজের সাথে মিথ্যা বলি। নিজেকে এভাবে প্রবোধ দেই – “আমি আসলে অতো খারাপ না। আমি যা করেছি তার কারণ আছে।” যখন আপনি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন, নিজের কাজের বৈধতা দেয়ার কথা ভুলে যান। কারণ যেসব অজুহাতের মাধ্যমে আপনি আপনার কাজের বৈধতা দিতে চান, তিনি ইতোমধ্যে তার সবগুলোই জানেন।

আল্লাহ জানেন আপনি কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তিনি জানেন এটা কঠিন সময় ছিল, তিনি জানেন অমুক অমুক বিষয় আপনাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলেছিলো। ” ইয়া রব, আমি অনেক চাপের মধ্যে ছিলাম তাই মদ খেয়েছি।” তাঁকে এভাবে বুঝাতে যাবেন না। তিনি আপনার সবগুলো অজুহাত সম্পর্কে আপনার চেয়ে ভালো জানেন। আপনাকে অকপটে তাঁর নিকট আসতে হবে কোনো ফিল্টার ছাড়া, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া, কোনো অজুহাত ছাড়া, কোনোরকম বিব্রতবোধ করা ছাড়া।

অনেক সময় নিজের পাপ স্বীকার করার সময় আমরা বিব্রত বোধ করি, এক রাশ লজ্জা এসে আমাদের জড়িয়ে ধরে। না, এটা যেন না হয়। লজ্জিত হয়ে ভুল স্বীকার করুন, অনুতপ্ত হোন নিজ পাপের কারণে। কিন্তু আল্লাহর কাছে ক্ষমার জন্য এসেছেন বলে লজ্জিত হবেন না। তিনি চান তাঁর ভুলকারী বান্দাগুলো তাঁর কাছে আসুক আর তিনি তাদেরকে হাসিমুখে ক্ষমা করে দিন।

কিন্তু যতক্ষণ না আপনি আল্লাহর নিকট অকপটে সকল পাপ স্বীকার করে নিচ্ছেন আর এভাবে যখন নিজের উপর যে অন্যায়গুলো এতদিন ধরে করে এসেছেন তা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে শুরু করবেন, আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে সে সময় আপনার চোখ দিয়ে কোনো অশ্রু নির্গত হবে না। একজন মানুষের পক্ষে এটা অসম্ভব যে, সে আল্লাহর সামনে এভাবে নিজেকে খোলাখুলিভাবে উপস্থাপন করলে তার চোখ দিয়ে কোনো অশ্রু বের হবে না। কারণ এটা দুর্বলতা প্রকাশের সময়।

দুনিয়ার সামনে আমরা সাধারণত নিজেকে শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী এবং দিব্যি সুস্থ হিসেবে উপস্থাপন করি। সবাই আমাদের দেখে মনে করে সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে আমি বহু সমস্যায় জর্জরিত তা কেবল আল্লাহ জানেন। আপনাকে সকল জড়তা কেটে তাঁর নিকট সম্পূর্ণ খোলাখুলিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে। কেবল তখনি আপনি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার অবস্থানে যেতে পারবেন।

তারপর সিজদায় গিয়ে কাঁদতে থাকুন। তখনি এই ক্ষমা চাওয়াটা অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবে। তখন আর এটা শুধু মনে মনে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলার মতো হবে না; এটা হয়ে উঠবে আল্লাহর সাথে একটি সত্যিকারের কথোপকথন, আল্লাহর নিকট সত্যিকার অর্থে পাপ স্বীকার। এটা খুবই শক্তিশালী একটি অনুশীলন। চেষ্টা করে দেখুন।

– উস্তাদ নোমান আলী খান

মতামত

comments