সততাই তাকওয়ার পথ

আজকের ছোট রিমান্ডারে আপনাদের সাথে আমি সুরা আল-ইমরান ৭৬ নং আয়াত-এর শিক্ষা শেয়ার করতে চাই। আল্লাহ্‌ আজ্ব ওয়া জাল এখানে খুব সুন্দরভাবে আমাদের কাছে তাঁর একটি প্রত্যাশা ও এর সাথে ত্বাকওয়ার ধারণা ও এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক বর্ণনা করেছেন। আমরা সবাই শুনেছি, আল্লাহ্‌র স্মরণ, আল্লাহ্‌ ভীতির কথা এবং আল্লাহকে অখুশী করা থেকে নিজেদের রক্ষা করার কথা কোরআনে আল্লাহ্‌ ত্বাকওয়ার কথা বলেছেন বিভিন্নবার। আমি সুনির্দিষ্ট ভাবে এই আয়াতটি শেয়ার করতে চাই কারণ রমজানের উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে; আল্লাহ্‌ নিজে বলেছেন,
“লা’আল্লাকুম তাত্বাক্বুন” –
যাতে তোমরা ত্বাকওয়া অবলম্বন করতে পারো। যাতে তোমরা আল্লাহ্‌র সম্পর্কে সচেতন হতে পারো। এবং আল্লাহ্‌ যে সীমারেখা অতিক্রম করতে নিষেধ করেছেন সে সীমারেখা অতিক্রম করা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারো। এটা হচ্ছে ত্বাকওয়া এবং এই হচ্ছে রমজানের লক্ষ্য। এই আয়াতটি বিপরীতমুখী।

এর আগের আয়াতটি দীর্ঘ এবং এতে আল্লাহ্‌ বলেছেন, কিতাবীদের কিছু মানুষকে(আহলে কিতাবীদের) যদি তুমি এক টাকা বিশ্বাস করে রাখতে দাও তারা তোমাকে তা ফেরত দেবে না, আবার তাদের মধ্যে এমন ও আছে যাদের তুমি যদি পাহাড় সমান সম্পদ রাখতে দাও তারা তোমাকে পুরোটাই ফেরত দেবে, এর মানে হলো তুমি তাদেরকে অনেক বিশাল অর্থ দিয়েও বিশ্বাস করতে পারো, তোমাকে ওসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না, এবং এরা হচ্ছে ইহুদী, খ্রিষ্টান সমাজ এবং এরা প্রতারক ও(Con-Artist)- তো এরা দুটোই। তো এদের সবাইকে একভাবে বিচার করবে না, ওদেরকে অতিরিক্ত বিশ্বাস ও করবে না আবার অতিরিক্ত সন্দেহের চোখে ও দেখবে না, ওগুলো সবই একক আলাদা ঘটনা। এরপর আল্লাহ্‌ বলছেন, “বালা মান আওফা বি’আহদিহী অত্তাক্বা ফাইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল মুত্তাক্বীন” যারাই প্রতিশ্রুতি পুর্ণ করবে তারাই ত্বাকওয়ার প্রমাণ দেবে। এই আয়াত অনুযায়ী ত্বাকওয়া মানে হলো অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করা। আমরা ভাবি ত্বাকওয়া হলো আধ্যাত্মিক ব্যাপার, যা আল্লাহ্‌র সাথে আরো একাত্ম করে, যত বেশি প্রার্থনা করবেন, যত বেশি দোয়া করবেন, যত বেশি নিজেকে আধ্যাত্মিক কাজে জড়াবেন তাই ত্বাকওয়া বৃদ্ধি করবেঃ এবং এটা সত্যি, এটা সত্যি আংশিকভাবে। যখন কোরআনে ত্বাকওয়া নিয়ে আলোচনা আছে অনেকবারই এমনভাবে ত্বাকওয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে যা আপনি আশাই করবেন না।

উদাহরণ স্বরুপ আপনি যদি আপনার বস্‌কে বলেন আপনি ৫টায় আসবেন এবং আপনি ৭টায় এলেন অথবা আপনি আপনার শিক্ষককে বললেন আপনি আপনার এসাইনমেন্ট জমা দেবেন ২ দিনে অথচ আপনি ২ সপ্তাহ লাগালেন সবই হচ্ছে আপনার কথা রাখা না রাখার উদাহরণ। মনে আছে এক টাকা অথবা পাহাড় সমান সম্পদ ছোট অথবা বড় এই আয়াতে এটা এখন আর আহলে কিতাবীদের কথা বলা হচ্ছে না, যারাই প্রতিশ্রুতি পূর্ন করে তারাই ত্বাকওয়ার প্রমাণ দেয়। যারাই অঙ্গীকার করে তা রক্ষা করে, তাদেরই ত্বাকওয়া আছে। যেন আল্লাহ্‌ এই দুইটি বিষয়কে সমান বলেছেন। সুবহানআল্লাহ! আপনি হয়তো অনেক মানুষকে দেখবেন আজকাল যারা ভাবে ত্বাকওয়া হয়তো আপনার বাহ্যিক অবয়বে, হয়তো ইসলামের বাহ্যিক কিছু আনুষ্ঠানিক আচারে আছে, নৈতিকতাকে বাদ দিয়ে, তারা মানুষের সাথে কি আচরণ করছে তা বাদ দিয়ে। অথচ আল্লাহ্‌ এই আয়াতে যেন বলছেন আপনার ভেতরেরটার সাথে মিল রেখে আপনার বাহ্যিক প্রকাশ হওয়া উচিৎ এবং মানুষের সাথে আপনার আচরণ ও সঠিক হতে হবে। এবং এই হচ্ছে রমজানের মাস আপনি এবং আমি, আমাদেরকে মানুষের সাথে সম্পর্কগুলো ঠিক করতে হবে এবং আমাদের দায়িত্বগুলো পালন করতে হবে। বাধ্যবাধকতা শুধু লিখিত নয়, লিখিত চুক্তি যা আপনি স্বাক্ষর করেন বা মৌখিক ভাবে অঙ্গীকার- এটা এক ধরণের দায়িত্ব, আমাদের সম্পর্কগুলোর ও দায় আছে, প্রতিটি সম্পর্ক ও একধরণের চুক্তি।

উদাহরণ স্বরুপ, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক ও একধরণের চুক্তি, অথবা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সন্তানের সাথে সম্পর্ক অথবা আমার প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক- এগুলো সবই অলিখিত, অনুচ্চারিত চুক্তি যাতে তাদের প্রতি আপনার দায়িত্ব আছে এবং আপনার প্রতি ও তাদের দায়িত্ব আছে। এই আয়াত অনুযায়ী ত্বাকওয়া হলো আমার সন্তানাদি, আমার স্ত্রী, আমার পিতা-মাতা, আমার বন্ধু-বান্ধব এবং অন্য মানুষের প্রতি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। তো আমি সত্যি আশা করি যেন আমরা এই মাসে ত্বাকওয়া অবলম্বন করতে পারি, এবং এর অংশ হিসেবে আমরা আমাদের সম্পর্কগুলো ঠিকঠাক করে নিতে পারি আমাদের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালনের মধ্য দিয়ে, সময় দিয়ে, অর্থ দিয়ে, যদি তারা আমাদের কোন সাহায্য চায় তা পূরণের মধ্য দিয়ে, যদি কোন কথা দিয়ে তা না রেখে থাকি তা পূরনের মাধ্যমে, আমাদের কাছে যদি তাদের কোন প্রত্যাশা থেকে থাকে যা যৌক্তিক এবং আমরা তা এতোদিন পালন না করে থাকি আমি আশা করি আমরা এখন থেকে তা ঠিকঠাক পালন করতে পারবো। এবং এর ফলে আমরা আরও বেশি ত্বাকওয়া অর্জন করতে পারবো কারণ আল্লাহ্‌ বলেছেন, “ফা ইন্নাল্লাহা ইয়ুহিব্বু আল মুত্তাক্বীন” নিঃসন্দেহে যারা ত্বাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ্‌ তাদের ভালোবাসেন। আল্লাহ্‌ আপনার আর আমার এই প্রচেষ্টাকে ভালোবাসেন। বারাকআল্লাহু লি ওয়ালাকুম, ওয়া-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

অনুবাদ করে দিয়েছেনঃ সানজিদা হাসনিন

(Visited 353 times, 1 visits today)

মতামত

comments