রামাদান কর্মপরিকল্পনা (১ম পর্ব)

রামাদান কর্মপরিকল্পনা (১ম পর্ব)

আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমি মনে করি আপনারা সবাই অবহিত যে রমযান মাস খুব দ্রুতই এগিয়ে আসছে। এবং এটাই উপযুক্ত সময়, আমরা যাতে আমাদের প্রত্যেকটি সুযোগকে কাজে লাগাই নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এবং যতটুকু সম্ভব নিজেদেরকে প্রস্তুত করে নিই এই মাসটির সম্পূর্ণ সুযোগ গ্রহণের জন্য। ক্ষমার প্রাপ্তির সুযোগ, আল্লাহ্‌র জান্নাত লাভের সুযোগ, এবং আমাদের ঈমানকে নতুন করে তরতাজা করার সুযোগ — আমরা যেন এই সুযোগগুলো কোন মতে না হারাই। আর তাই আমি মনে করেছিলাম এটি একটি উপযুক্ত সময় আমার নিজের এবং আমার পরিবারের স্মরণের জন্য এবং আপনি এবং আপনার পরিবারের স্মরণের জন্য, যে কী কী উপায়ে আমরা রমযান থেকে সবচাইতে বেশি লাভবান হতে পারি। 

সেই কারনেই আমি খুৎবার শুরুতে রমযান সম্পর্কিত আয়াতটি তেলাওয়াত করেছি, এটি কুর’আনে উল্লেখিত রমযান সম্পর্কিত একমাত্র আয়াত। তবে সম্পূর্ণ আয়াতটি বর্ণনা না করে, আমি আয়াতটির শেষাংশের দিকে দৃষ্টিপাত করতে চাই। সাধারনত খুৎবার সময়টুকু হয় আধঘণ্টা বা তার কম, এবং আয়াতের শুরুর অংশ বর্ণনা করতে করতে এত সময় পেরিয়ে যায় শেষের দিকে গেলে আপনি অত মনোযোগ দিতে পারেন না, অথবা খতীবের কাছে খুব কম সময় থাকে রমযান সম্পর্কিত এই আয়াতটির শেষাংশের প্রাচুর্যটা তুলে ধরার। তাই, ইন শাা আল্লাহু তা’য়ালা, আমার আজকের খুৎবা হবে শুধুমাত্র আয়াতটির শেষের অংশ নিয়ে, সুবর্ণ এই রমযান মাস সম্পর্কিত আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের বাণীগুলো নিয়ে।

আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ আপনার জন্য সহজ করতে চান, তিনি আপনার জন্য কাঠিন্য চান না”। কাউকে এটা বলাই যথেষ্ট যে ‘আমি চাই তোমার কাজগুলো সহজ হোক’, তার উপরে এটা না বললেও হয় যে ‘আমি চাই না যে তোমার কাজগুলো কঠিন হোক’ । আপনি বলতে পারেন ‘আমি চাই খাবার টা সুস্বাদু হোক’। আপনার বলতে হবে না, ‘আমি চাই না খাবার টা খেতে খারাপ হোক’। ব্যাপারটা বলা হয়ে যায় যখন আপনি বলেন, ‘আমি চাই খাবার টা সুস্বাদু হোক’। 

সুতরাং যখন আল্লাহ বলেন আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করতে চান, এই কথার মাধ্যমে এটা বোঝা যায় যে, স্পষ্টভাবেই তিনি আমাদের জন্য কঠিন চান না। কিন্তু আল্লাহ আগ বাড়িয়ে আরও বলেন,  “এবং তিনি তোমাদের জন্য কাঠিন্য চান না।”

আল্লাহ কেন এমন বললেন? সুবহানাহু ওয়া তা’লা। এই ধরণের পুনরাবৃত্তিমূলক কথা, একবার কিছু বলা তারপর আবার বলা, এরকম বলা হয় আপনাকে আরো বেশি উপলব্ধি করানোর জন্য। ভাষার এরকম ব্যবহার করা হয় এমন ক্ষেত্রে, যখন শ্রোতা অনুপ্রাণিত নয়। 

এমন ও মানুষ আছে, যারা রমযান আসছে শুনে বলেন, ‘টেক্সাসে রমযান এবার জুলাই মাসে! অনেক কষ্ট করতে হবে।’ এই ধরণের কথা মানুষ বলে, হয়তো এরকম কথা তারা তাদের বন্ধু বা পরিবারের সাথে বলছে না, কিন্তু মনের মধ্যে নিজেদের সাথে এরকম কথোপকথন চলছে ! আর এ ধরণের মানুষের প্রসঙ্গে, আল্লাহ যেন বলেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, জটিল করতে চান না। তিনি চান না যে আপনি কষ্টে থাকেন। আপনাকে দুঃখ – বেদনায় ফেলে তিনি এটা উপভোগ করেন না। আপনি রোদের মাঝে সারাদিন কাটাবেন, ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় ভুগে কষ্ট পাবেন, এরকম আল্লাহ চান না। মূলবিষয় এটা নয়। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ আপনার জন্য সহজ করতে চান”।

এই আয়াতে আমাদের জন্য বহু উপহার রয়েছে । অন্যতম অপূর্ব একটি উপহার হল যে, রমযান মাসে, আল্লাহ রোজা রাখা সহজতর করে দেন অন্য যে কোন সময়ের তুলনায়। তো, আপনি যদি রমজানে রোজা রাখেন, তা আপনার জন্য সহজ হবে। কিন্তু আপনি যদি রমযানের বাহিরে (অন্য কোন মাসে) রোজা রাখেন, আপনারা যারা চেষ্টা করেছেন, দেখবেন অন্য সময় রোজা রাখা দশগুণ কষ্টকর হয়ে পড়ে। আপনার শক্তি ফুরিয়ে যায়। টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে যায় । আল্লাহ আপনার জন্য বিশেষ (ভাবে) সহজ করেন এই মাসে। 

এ আয়াতটিতে আমাদের জন্য আরও উপকার নিহিত আছে। শুধুমাত্র এই বাক্যটিতে যদি আমরা লক্ষ্য করি, আরেকটি রত্ন হচ্ছে যে, আল্লাহ আমাদেরকে একটুখানি কষ্টের মধ্যে রাখার বিনিময়ে আমরা যা অর্জন করি— ঈমানের পরিপক্কতা, তাকওয়া, খোদা-ভীতি, আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জন, গুনাহ করা থেকে দূরে থাকা, মন্দ কথাবার্তা থেকে দূরে থাকা, তাছাড়া ৩০ দিনের জন্য আমরা শয়তানের কুপ্রভাব থেকে দূরে থাকি। এটি আমাদেরকে তৈরি করে আমাদের এখানকার জীবনকে পরিচালনা করার জন্য, যাতে করে আমদেরকে আসল কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়, আসল কাঠিন্য হচ্ছে যখন আমরা আল্লাহ্‌র সামনে দাঁড়াবো। এবং যাদের রমযান কবুল হয়েছে, কেয়ামতের দিন হবে তাদের জন্য সহজতর, কারন তাঁরা আল্লাহ্‌র ক্ষমা অর্জন করেছেন। তাঁরা কেয়ামতের দিন বিপদে থাকবেন না। আল্লাহ যেন আমাদের কে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। 

আবার পরের অংশটিও, খুবই অদ্ভুত ! আল্লাহ আগেই বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে যেন এ মাসের রোযা রাখে।” তো, আয়াতটির প্রথম দিকের অংশে আল্লাহ বলেছেন এই মাসে তোমাদের রোজা রাখতে হবে। পুরো মাস। ঠিক আছে।

এখন তিনি বলছেন,“যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর ।” যেহেতু তিনি একবার বলেছেনই সারা মাস রোজা রাখ, তাহলে গণনা পূরণ বলতে আবার তিনি কী বুঝাচ্ছেন ? আল্লাহ কি পুনরাবৃত্তি করছেন, তিনি কি একই কথা আবার বলছেন, আসলে, এখন তিনি আরও বেশি তথ্য দিচ্ছেন আমাদের। আরবিতে “ ইকমাল “ শব্দটি এসেছে “ কামাল “ থেকে। এবং আরবিতে “ কামাল “ অর্থ শুধুমাত্র সম্পূর্ণতাকে বোঝায় না, এটি উৎকর্ষতা কেও (perfection) বোঝায়। যখন আর কিছু বাকি থাকে না। আল্লাহ শুধু চান না যে আমরা রোজা রাখি, আল্লাহ চান আমাদের ৩০ টি দিন যথাযথ হয়। যথাযথভাবে ৩০ দিন। ব্যাপারটি শুধু রোজা নিয়ে নয়। রোজা নিয়ে আগে কথা বলা হয়েছে, তবে আরও বহু কাজকর্ম আছে যেগুলোতে আমাদের সম্পূর্ণতা আনতে হবে, এই ৩০ দিনে। 

এবং উৎকর্ষতার উদ্দেশ্যেই আমাদের প্রচেষ্টা, এই ৩০ দিনে। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল যেন আমাদের সবাইকে রমযান মাসে ইকমাল দান করেন। এর অর্থ কি দাড়াচ্ছে ? কিভাবে আমরা সম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য চেষ্টা চালাতে পারি এই ৩০ দিনে? আমাদের কি পরিপূর্ণ করতে হবে? কোন জিনিসটি এখানে অপূর্ণ ? দেখুন, আমরা মানুষরা, স্বভাবগত কারনে, অনেক ভুল করে থাকি। আমরা ভুলে যাই। আমাদের নামাজ তো নিখুঁত হয় না। আমাদের ওজু তো সম্পূর্ণ রুপে নিপুন হয় না। আমরা পরিপূর্ণ রুপে রোজা রাখি না। আমাদের দৃষ্টি সেরকম ঠিক থাকছে না, যেরকম থাকা উচিৎ। আমার জিহবা তো তা বলে না যা বলা উচিৎ। তবে এই ৩০ দিন আপনি প্রচেষ্টা করেন আপনার জিহবা কে শুধরানোর জন্য। আপনি কঠোর পরিশ্রম করেন আপনার দৃষ্টিকে ঠিক করার জন্য। আপনি কঠোর পরিশ্রম করছেন আপনার কান নিয়ে। সুতরাং যখন আমরা এই ব্যাপারে বলি, আমাদের একটু থেমে কিছু ব্যাবহারিক উপদেশ নেয়া উচিৎ। 

এবং আমি মনে করি, আমরা প্রায়ই কথা বলি তাকওয়া বৃদ্ধির ব্যাপারে, ভাল মানুষ হওয়ার ব্যাপারে, বিশেষ করে রমযান মাসে। কিন্তু আমি মনে করি, আপনাদেরকে কিছু নির্দিষ্ট উপদেশ দেয়া উচিত। আমি জানি এখন গ্রীষ্মকালীন ছুটি । আর আমি দর্শকদের মাঝে অনেক শিশুকিশোরদের দেখতে পাচ্ছি। যেই শিশুরা এখানে আছো, আমি তোমাদের সাথে আগে কথা বলছি। যদি তোমাদের বাবা-মা তোমাদেরকে i-pod দিয়ে থাকেন বা মোবাইল ডিভাইস বা তোমাদের হয়ত পোর্টেবল playstation আছে বা ঘরে তোমাদের x-box বা Wee আছে। রমযানের জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নাও। রমজানে সব ভিডিও গেইম বাদ। নিজেকে এখন থেকে তৈরি করো।

কোন গেইমস নয়। যদি মোবাইলে apps থাকে, সেগুলো ডিলিট করে দাও। দুশ্চিন্তা করো না, কান্নাকাটি করো না । তোমার বাবা আবার সেগুলো ডাউনলোড করে দিবেন যখন রমযানের পর শয়তান আবার ফিরে আসবে। এখনকার জন্য, apps গুলো ডিলিট কর। সেগুলো মুছে ফেলো। রমজানে কোন Netflix নয়। YouTube ও নয়। এগুলো ত্যাগ কর।এখন থেকে শুরু কর। ভাল কাজের কথা বলার আগে আমাদেরকে ক্ষতি টা থামাতে হবে। আল্লাহ্‌র জিকির শুরুর পূর্বে আমাদেরকে গাফিলতি তথা উদাসীনতার রাস্তাগুলো বন্ধ হবে। যে জিনিসগুলো আমাদেরকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে সেগুলোকে আগে থামাতে হবে। তারপর আমরা কথা বলবো আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল কে স্মরণ করার ব্যাপারে।সুতরাং, এখন থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে নাও, ৩০ টি ভাল দিন আসন্ন । যে সময়ে তুমি নিজেকে বিভ্রান্ত করবে না, ভিডিও গেইম নয়, সিনেমা, কার্টুন, টিভি সিরিজ নয়। এরকম সকল জিনিস থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। আর তোমরা শিশুরা যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে আসো এগুলো থেকে, তার মানে অবশ্যই বাবা-মা দের উদ্দেশ্যে একই কথা। 

আপনাকে তো সব খবর দেখতে হবে না। এই অজুহাত দিবেন না যে আমি খবর দেখছি। কারন আপনি আসলে খবর দেখছেন না। আপনি পৃথিবীর ঘতনাপ্রবাহ পরিবর্তন যাচ্ছেন না, তো, অস্থির হয়ে পড়বেন না। আপনি অতি আগ্রহী থাকলে কিছু আর্টিকেল পড়তে পারেন। শিশুকিশোরদের জন্য ১ নম্বর কাজ হল, এই মাসে ভিডিও গেইমস বাদ দাও। আমি বলছি না সারা জীবনের জন্য কারণ আমি জানি, এটা ছাড়া তোমরা বাঁচতে পারবে না । এটি তোমাদের কারও কারও জন্য অক্সিজেনের মত । এতে কষ্ট হবে। কিন্তু তবুও এটা করো। এই মাসটিকে পরিপূর্ণ করার জন্য এটা তোমাদের কাজ । আরেকটা জিনিস যেটা এখানে বসে থাকা সকল বাচ্চাদের করা উচিৎ এবং বাবা-মা’র উচিৎ তাদেরকে উৎসাহিত করা, সকল শিশুকিশোরদের এটা করা উচিৎ—তোমাদের একটি লক্ষ্য থাকা উচিৎ যে এই মাসে তোমরা কুর’আনের একটি নির্দিষ্ট অংশ মুখস্ত করবে। 

একটি লক্ষ্য থাকা উচিৎ যে প্রতিদিন আমরা এক ঘণ্টা সময় দিয়ে কুর’আন মুখস্ত করবো।হয়তো তুমি জীবনেও কুর’আন মুখস্ত করোনি, এবং তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন থাকতে পারে, যারা মসজিদে আসে শুধু জুমু’আর দিন। হতে পারে তুমি শুধু রমজানে মসজিদে আসো। আমি তোমাদেরকে দোষারোপ করছি না। 

আমার শুধু বলতে চাচ্ছি যে, দেখ, কুর’আন আমাদের সবার জন্য। এটি তোমার পরিবারের জন্য। আপনি মসজিদে আসেন আর নাই আসেন, কুর’আনের অধিকার আছে আপনার উপর এবং আপনার সন্তানদের উপর। সে জন্য আপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে কুর’আন মুখস্ত করার উপর। এবং বাচ্চারা (তোমাদের বলছি), তোমরা গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে আছো, তোমরা সময় পাবে যখন শয়তানের কুপ্রভাব তোমাদের ধরবে না, তো যখন তোমরা আন্তরিকতা সহকারে (কুর’আন) মুখস্ত করতে বসবে, তোমরা ঘুমিয়ে পড়বে না, যা তোমরা সাধারনত করো, শয়তান এসে তোমাদের ঘুম পাড়িয়ে দেয় যখন তোমরা আল্লাহ্‌র কিতাবের সঙ্গে সময় কাটাও। যখন তোমরা আল্লাহ্‌র কিতাবের সঙ্গে সময় কাটাও। তবে শয়তান সেটা করবে না কারন সে এটা করতে পারবে না, সে রমজানে শৃঙ্খলিত থাকে। এই সুযোগটির সুবিধা নাও। কেউ কেউ জানেও না কিভাবে মুখস্ত করতে হবে। আমার খুৎবার বিষয় এই নয় যে আমি তোমাদের কিভাবে কুর’আন মুখস্ত করবে তা বলবো, তবে কিছু সহজ কাজকর্ম করতে পারো, শুধু একটি আয়াত পড়। যদি কুর’আন যথাযথ ভাবে পড়তে না জানো, ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নাও কোন ধীর তেলাওয়াত। ইন্টারনেটে প্রচুর আছে, তাই নয় কি? একটি আয়াতের তেলাওয়াত শুনবে, ভাল মত তা পড়বে, দশবার পাঠ করবে, দেখবে এবং দশবার পড়বে। তারপর না দেখে দশবার পড়ার চেষ্টা করো। তারপর পরের আয়াত ১০ বার পড়। তারপর আয়াত দুটি একসাথে ১০ বার পড়। এভাবে। দেখে ১০ বার পড়। তারপর না দেখে ১০ বার পড়। এবং তোমার অজান্তেই দেখবে তুমি কুর’আন মুখস্ত করা শুরু করে ফেলছ।

 

 

(Visited 358 times, 1 visits today)

মতামত

comments