বিনয়ের সাথে ভদ্রভাবে চলা

বিনয়ের সাথে ভদ্রভাবে চলা

কুরআন উইকলি তে দেয়া উস্তাদ নুমান আলী খানের “Quranic Gems”  সিরিজ থেকে নেয়া।

” আল্লাহ্‌র বান্দারা পৃথিবীতে বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞলোক তাঁদের আক্রমণ করে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের মোকাবেলা করে। ”    সুরা ফুরকান-৬৩


আসসালামু আলাইকুম কুরআন উইকলি, আল্লাহ্‌ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা সুরা আল-ফুরক্বান এর শেষে সুরা নম্বর ২৫ এ বর্ণনা করেছেন কারা আর-রাহমান (পরম করুণাময়)-এর বান্দা। আল্লাহ্‌র অনেক নাম আছে জা তিনি এখানে উল্লেখ করতে পারতেন, আল্লাহ্‌র বান্দা, সৃষ্টিকর্তার বান্দা, মহাজ্ঞানীর বান্দা, কিন্তু যখন তিনি বলছেন, পরম করুণাময়ের বান্দা এর মানে যেন উনি বলছেন এই মানুষগুলোর সাথে তাঁর সম্পর্ক তাঁর অভাবনীয় ভালোবাসা, দয়া এবং মমতার ভিত্তিতে। তার মানে এমন এক সত্তার বান্দা যিনি অনেক মমতাময় , যিনি অনেক বেশি ভালোবাসেন, যিনি অভাবনীয় রকম দয়া দেখান তাঁর বান্দা। তার মানে এই মানুষগুলো বিশেষ ধরণের মানুষ। এইখানে আল্লাহ্‌ যাঁদের কথা বলছেন তাঁরা খুবই বিশেষ ধরণের মানুষ। সকল বিশ্বাসীরাই স্পেশাল কিন্তু এঁরা আরো অনেক অনেক বেশি স্পেশাল। এবং এই স্পেশাল মানুষদের যাদেরকে তিনি বলেছেন “ওয়া ই’বাদুর রাহমান”।

তাঁদের প্রথম গুণ হচ্ছে, الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا “আল্লাজীনা ইয়ামশূনা আ’লাল আরদি হাওনান” তাঁরা পৃথিবীতে চলে, পৃথিবীতে তাঁরা চলাফেরা করে বিনম্রতার সাথে هَوْنًا ‘হাওনান’ কোমলভাবে এবং তাঁদের নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করে। আপনি জানেন যখন আমরা কোন কিছু অর্জন করি, আমরা একধরনের শক্তি, জোড় আর ক্ষমতা অনুভব করি। এবং ঐসব মুহূর্ত আসলে আমাদের নগণ্যতা অনুভব করার কথা। এটা প্রথম কথা, هَوْنًا ‘হাওনান’ মানে এটাও যে আপনি অন্যদের সামনে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করবেন না, আল্লাহ্‌ এ সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ্য করেছেন।

উদাহরণ স্বরূপ, পিতামাতার সামনে নম্রভাবে মাথা নত করে দেয়া এর মানে কী? এরমানে হলো আপনি পূর্ণবয়স্ক, আপনি পেশাজীবী, আপনার টাকা আছে, আপনার নিজের গাড়ী আছে, বাড়ী আছে আর আপনার বাবা-মা রিটায়ার্ড, বৃদ্ধ। তো অবশ্যই আপনি ক্ষমতাশীল অবস্থানে আছেন এবং ওনারা দুর্বল অবস্থানে তাই বলে বেশি ভাব দেখানোর প্রয়োজন নেই। অনেক বেশি হম্বিতম্বি করা উচিৎ নয়। আপনার নমনীয় হওয়া দরকার ও তাঁদের সাথে বিনম্র আচরণ করা উচিৎ।

একবার এক ভাই-এর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো, সম্প্রতি আমি যখন ভ্রমণ করছিলাম, একভাই আমাদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে নিতে এলো, আমাদেরকে সব জায়গা ঘুরে দেখালো এবং আমাদের সবকিছুর খেয়াল রাখলো। এই লোকটি পুরো চাকরের মতো আমাদেরকে সব জায়গায় নিয়ে গেলো, খেতে, বক্তৃতা দিতে, এটা ওটা সব কিছুর জন্য। “আর কিছু লাগবে? আপনাদের পানি লাগবে? এটা করবো? ওটা করবো?” খুবই বিনয়ী এক ভাই। ট্রিপ শেষে আমারা জানতে পারলাম এই লোকটি প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের মালিক। এটা মাথা খারাপ হয়ে যাবার মতো। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিভাবে সম্ভব? কিভাবে মানুষ এইরকম বিনয়ী হতে পারে? আমি জানি কিছু মানুষ আছে যারা ১ লাখ ডলার আয় করেই ভাবে তারা পুরো পৃথিবীর মালিক হয়ে গিয়েছে। তারা সিক্স ফিগারের কিছু বেশি আয় করেই ভাবে “ঠিক এটাই”। এই লোকটির বিনয় আমাকে হতবাক করে দিলো। কিভাবে পারে?

আমার মনে পড়লো, وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا “ওয়া ই’বাদুররাহমানিল্লাজিনা ইয়ামশূনা আ’লাল আরদি হাওনান” এইটা নাম্বার ওয়ান। তাঁরা পৃথিবীতে চলতে শেখে বিনম্রতার সাথে। বিনম্রতা শুধু আর্থিক অবস্থার প্রকাশ নয়, এটা শারীরিক শক্তি এবং ক্ষমতারও নমনীয় প্রকাশ। এটা হতে পারে, এইটা প্রদর্শন করা যে আপনি কাউওকে কথায় হারিয়ে দিতে পারেন, হতে পারে আপনি খুবই রাগী,বহির্গামী মানুষ। আপনি অনেক ঠাট্টা করতে পছন্দ করেন। আপনি যে কাউকে চুপ করিয়ে দিতে পারেন, বিশেষত সবার সামনে। আপনার শান্ত হওয়া দরকার এবং এথেকে বিরত থাকা উচিৎ। কারণ, এটা একধরণের ঔদ্ধত্যের প্রকাশ, এর মানে আপনি আপনার কথা দিয়ে অন্যের উপর প্রভাব খাটাচ্ছেন। আপনি আপনার কথা দিয়ে কাউকে অপদস্থ ও অসম্মানিত করতে পারেন। আপনি কোন একটা ক্ষেত্র সম্পর্কে জানেন এবং আপনি শুধু আপনার জ্ঞান দিয়ে অন্যদের ধাঁধা লাগিয়ে দিতে চান। এটা করবেন না। এটা ভালো যে আপনি জানেন কিন্তু আপনাকে প্রতিটি লেকচারে তা প্রমাণ করতে হবে না। একজন শিক্ষক, একজন শিক্ষক এর কাজ হলো শিক্ষা দেওয়া উনি কতটা জানেন তা প্রমাণ করা নয়। আপনার এটা করতে হবে না। আপনি শুধু নিজের মতো থাকুন। আপনি যা তাই থাকুন। মানুষের সামনে বিনম্র থাকুন। পারলে নিজের যোগ্যতা গোপন রাখুন যদি এর প্রকাশে অন্যদেরকে আপনার প্রতি ভীত করে তোলার সম্ভাবনা থাকে। তো এটা হলো هَوْنًا ‘হাওনান’। এর আরেকটি ভাগ আছে। এবং এই ভাগ আমি খুবই ভালোবাসি। وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

“ওয়াইজা খাতাবাহুমুল জাহিলূনা ক্বালূ সালামা” প্রত্যেকটা শব্দ এখানে মনোযোগের দাবী রাখে। অন্তত এই ছোট্ট ক্লিপ এ। তো আমি প্রতিটি শব্দ কে এর যথাযথ গুরুত্ব দিবো ইন শা আল্লাহ্‌। إِذَا ‘ইজা’ إِذَا ‘ইজা’ মানে ‘যখন’, ‘যদি’ নয়। এর মানে হল, যেই পরিস্থিতির বর্ণনা করা হতে যাচ্ছে এটা হবেই। এটা ঘটবেই। এরকম অবস্থার মুখোমুখি আপনাকে হতে হবেই। তো পরিস্থিতিটা কী? خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ “খাতাবাহুমুল জাহিলূনা” যেসব মানুষ নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, যারা নিজেদের কথায় এবং আচরণে খুবই আপত্তিকর, ভীষণ আক্রমণাত্মক। যখন সেসব মানুষ তোমাদের সাথে কথা বলে এবং এটা ঘটবেই। জীবনে আপনাকে এধরণের কঠিন মানুষের মোকাবেলা করতে হবেই। এটা জীবনের একটা বাস্তবতা। এটা এড়ানোর কোন উপায় নেই।

إِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَا “ইজা খাতাবাহুমুল জাহিলূনা” এখন অন্য ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে, কথা বলতে যাননি। ওরা এলো এবং তোমার সাথে কথা বলল তো ‘ওরা’ এখানে কর্তা, যার মানে এই যে আপনি হয়তো কোন ঝামেলা চাচ্ছেনই না, ঝামেলা আপনার কাছে এলো এবং এটা হবেই। তো আপনি ঝামেলা চাইছেন না মানে এই নয় যে ঝামেলা আপনার কাছে আসবে না। إِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا “ইজা খাতাবাহুমুল জাহিলূনা ক্বালূ সালামা” যখন উদ্ধতরা, না উদ্ধতরা নয়, অজ্ঞরা, হিংস্ররা তাঁদের সাথে কথা বলে, এমনকি যারা অসভ্য তাঁদের সাথে কথা বলে, তাঁরা বলে, এখন এখানে قَالُوا سَلَامًا “ক্বালূ সালামা” দুটি অর্থ প্রকাশ করতে পারে, একটি হল, তাঁরা বলে, ‘শান্তি’। অন্যভাবে বললে, তাঁরা হয়তো বলে, “শান্ত হও। দেখ, এটা সম্ভবত এনিয়ে আলাপ করার জন্য ভালো সময় নয়, আমরা অন্যসময়ে কথা বলবো”। অথবা এরকম কিছু। তাঁরা এধরণের আলোচনা থেকে নিজেদের দূরে রাখেন। তাঁরা এমন না যা কোন বোকামি ধরণের কথা শুনে বলবে, “তুমি জানো তুমি কত বোকা। দাঁড়াও তোমাকে বোঝাচ্ছি তুমি কত বোকা”। না, না, না। ‘শান্তি’। তাঁরা এরকম আলোচনায় যায় না। তাঁরা শুধু বলে سَلَامًا “ক্বালূ সালামা”।

আজকের দিনে এটা শুধু আপনি কারো সাথে কথা বলার সময় নয়, এটা হতে পারে WhatsApp গ্রুপে ও। এটা একটা Facebook পোস্টে হতে পারে। এটা হতে পারে আপনার সম্পর্কে একটা YouTube ভিডিওতে কিংবা এর নিচে যাচ্ছেতাই কোন মন্তব্যে। আপনার এগুলো কোনকিছুর জবাব দিতে হবে না, বাদ দিন। একদম ছেড়ে দিন, سَلَامًا ‘সালামান’ এবং বিশেষত ব্যক্তিগতভাবে যখন আপনি কারো সাথে সামাজিক পরিসরে কথা বলছেন এবং তারা একটু বাঁকা রাস্তায় যাচ্ছে আপনি থেমে যান। কখনো এটা মসজিদে হতে পারে। আপনারা মসজিদে যাচ্ছেন, কোন বয়স্ক মানুষ হয়তো আপনার সাথে একটু বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেনঃ “তুমি জান না কিভাবে নামায পরতে হয়! এভাবে কেন দাঁড়িয়েছ? আস্তাগফিরুল্লাহ, তুমি ট-শার্ট পড়েছ বা এইরকম কিছু”। তারা একদম এইভাবে আপনার সাথে কথা বলবে। আর আপনার মনে হবে, “থামো বুড়ো। যাই হোক, এসবের আমার দরকার নেই”। আপনি বেরিয়ে গেলেন। না, না, না। শুধু বলুন, ‘শান্তি’। ঐ আংকেলের জন্য দোয়া করুন। তাঁকে চেঁচামেচি করতে দিন আপনি অন্য জায়গায় গিয়ে নামায পড়ুন। অন্য কোণায় গিয়ে প্রার্থনা করুন। এটুকুই। বাদ দিন। ওটা আপনাকে পেয়ে বসতে দেবেন না।

قَالُوا سَلَامًا “ক্বালূ সালামা”-র অন্য অর্থ হচ্ছে তারা শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলে। তো ‘সালামান’-কে ‘হাল’ ধরতে পারেন, বাংলায় যাকে বলে ক্রিয়া বিশেষণ এবং আপনি যেভাবে ভাবতে পারেন, ধরেন ওরা আপনার সাথে কথা বলছে খুব আক্রমণাত্মকভাবে, রাগের সাথে, খুবই উদ্ধত কণ্ঠে, খুবই বেয়াদবের মতো, এমন ভাবে যেন তারা চাইছেই আপনি একটা প্রতিক্রিয়া দেখান কিন্তু আপনি কথা বলছেন শান্তভাবে। তারা যেন আপনাকে রাগান্বিত করতে না পারে। আপনি এধরণের আলোচনায় নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছেন এবং এটা এরকম নয় যে, মানে আপনাকে পুরো অন্যরকম কিছু করতে হবে, “থেমে যাবো, এই থেমে যাওয়াটা কী কঠিন!” না, না, না। আপনি এমন একধরণের সহনীয়তা নিজের মাঝে গড়ে তোলেন যে আপনি এধরণের কথা খুব সহজেই ঝেড়ে ফেলতে পারেন। এসবকে আপনি গভীরভাবে নেন না, আপনার নিয়ন্ত্রণ হারান না এবং আপনি এসব খুব যৌক্তিক এবং স্বাভাবিকভাবে মোকাবেলা করতে পারেন। এই কাজটিই একটি দাওয়াত।

আল্লাহ্‌ বলেছেন, আল্লাহ্‌ এসব মানুষদের ভালবাসেন। আল্লাহ্‌ পড়ে বলেছেন বিশ্বাসীদের অন্য যোগ্যতাগুলো নিয়ে, যেমন তারা রাতভর প্রার্থনা করে, ক্বিয়াম আল-লায়ল, তাহাজ্জুদের নামায। উনি অন্য বিষয় ও বর্ণনা করবেন তাঁদের নিয়ে কিন্তু উনি যে প্রথম বর্ণনা দিয়েছেন, তাঁদের প্রথম গুণ হলো, বিনয়। তাঁরা অন্যদের ছোট করে না এবং যখন অন্যরা তাঁদের অপমান করে, তাঁরা খুব শান্তির সাথে পরিস্থিতির মোকাবেলা করে। কিংবা যদি তাঁরা না জানে কিভাবে তাদেরকে মোকাবেলা করবে তাঁরা শুধু বলে, ‘শান্তি’ এবং এই বলে চলে যায়। وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا “ওয়াইজা খাতাবাহুমুল জাহিলূনা ক্বালূ সালামা” আল্লাহ্‌ আমাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা দিন এবং সাধারণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিন যাতে আমরা এই আয়াতের উপর আমল করতে পারে যখন পরিস্থিতি আসে। এই আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা সহজ, এ নিয়ে ভিডিওতে কথা বলা সহজ, এগুলো শোনা সহজ কিন্তু যখন পরিবারে বা বন্ধুদের মাঝে কোন কিছু ঘটে কিংবা মসজিদে বা কলেজে যখন এরকম পরিস্থিতি আসে তখন এই আয়াতের উপর আমল করা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। আল্লাহ্‌ আমাদের প্রজ্ঞা দিন এবং এইরকম পরিস্থিতি তৈরি হলে এই আয়াত অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দিন। বারাকআল্লাহু লি ওয়ালাকুম, ওয়া-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। 

(Visited 1,713 times, 1 visits today)

মতামত

comments