প্রত্যাশার মাস রামাদান (৫ম পর্ব)

আর যখনই আপনি দোয়া করবেন .. আল্লাহ সাথে সাথেই তার জবাব দিবেন। এই আয়াতটি রামাদান প্রসঙ্গে। বিশেষ করে আল্লাহ যেহেতু রমজান মাসে কুরআন প্রেরণ করেছেন, তাই এই মাসে তাঁকে ডাকতে থাকুন। আল্লাহর কাছে বিভিন্ন জিনিস চাইতে থাকুন, আল্লাহর সাথে কথা বলুন, আল্লাহর সাথে কথা বলুন যখন আপনি একা থাকেন, আল্লাহর সাথে কথা বলুন যখন আপনি গাড়িতে থাকেন। আপনাকে আরবিতে কথা বলতে হবে না, তাঁর সাথে পাঞ্জাবি, বাংলা, ইংরেজি যেকোনো ভাষায় আপনি কথা বলতে পারেন। আপনাকে তাঁর সাথে বইয়ের ভাষায় কথা বলতে হবে না, সাধারণ কথ্য ভাষায়ও কথা বলতে পারেন। আল্লাহ সব ভাষা বুঝেন। আপনি যদি কুরআনের ভাষায় কথা বলতে না পারেন, সমস্যা নেই। আল্লাহ আপনার নিকট থেকে সর্বপ্রথম যে বিষয়টা চান তা হলো, তাঁর সাথে আপনি যোগাযোগ করুন, তাঁর সাথে কথা বলুন, তাঁকে ডাকুন।

কতজন মানুষ আসলে আল্লাহকে ডাকে, তাঁর সাথে কথা বলে, তাঁর নিকট কাকুতি-মিনতি করে, কান্নাকাটি করে? এভাবে একা একা আল্লাহর সাথে কথা বলার সময় কেউ দেখে ফেলবে ভেবে আমরা বিব্রত ফিল করতে পারি। মানুষ ভাবতে পারে আমার হয়তো মাথায় সমস্যা আছে। এটাকেই বলা হয় ঈমান বিল গায়েব। অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস। আপনি যদি বিব্রত ফিল করেন, তাহলে মনে হতে পারে, তিনি আসলে আমার কথা শুনছেন না। যদি আসলেই বিশ্বাস করেন যে, তিনি আপনার কথা শুনছেন তাহলে তাঁর সাথে কথা বলুন। মানুষ যাই মনে করুক না কেন তাতে কিছু যায় আসে না। এই কথোপকখন শুধু আল্লাহ এবং আমার মাঝে।

তাই তিনি আপনাকে প্রস্তাব দিচ্ছেন যে, “যখনই তুমি আমাকে ডাকবে আমি তার জবাব দিবো।” আর এর বিনিময়ে তিনি আপনার নিকট একটা অনুরোধ করছেন – فَلْيَسْتَجِيبُوا – “কাজেই তাদের কমপক্ষে আমার ডাকে সাড়া দেয়ার চেষ্টা করা উচিত।”

আপনি আল্লাহর সাথে কথা বলছেন, আর আল্লাহ বলছেন, হ্যাঁ, আমি তোমার ডাকে সাড়া দিবো; কিন্তু তোমারও আমার ডাকে সাড়া দেয়া উচিত বা অন্তত সাড়া দেয়ার চেষ্টা করা উচিত। তিনি বলেন নি সাড়া দাও। কারণ এটা যদি বলা হতো, তার মানে হতো, আপনাকে নির্ভুল এবং নিখুঁতভাবে সাড়া দিতে হবে। তিনি বলেছেন – “সাড়া দেয়ার চেষ্টা করো।” ইস্তিজাবা, তুমি সাড়া দেয়ার চেষ্টা করছো এটা অন্তত আমাকে দেখাও।

এখন আপনি যদি কারো ডাকে সাড়া দিতে চান, প্রথমত আপনাকে তাঁর ডাক শুনতে হবে। কারো ডাক শুনতে না পেলে আপনার পক্ষে তো আর তার ডাকে সাড়া দেয়া সম্ভব নয়। যদি কোনো অনুরোধ করা না হতো তাহলে তো আর সাড়া দেয়ার প্রশ্ন আসে না। যদি কোনো প্রশ্ন করা না হয় তাহলে তো আর জবাব দেয়ার কথা আসে না।

সুতরাং আল্লাহ যেহেতু আপনাকে সাড়া দিতে বলছেন তার মানে তিনি আপনাকে প্রথমে তাঁর কথা শুনতে বলছেন। কিন্তু কিভাবে আপনি আল্লাহর কথা শুনবেন? আরে! সেটা তো আল কুরআন।
যখন আপনি আল কুরআন তিলাওয়াত করছেন, যখন আপনি আল কুরআন শুনছেন, যখন আপনি কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা করছেন – আপনি এমন একটি বিষয় শুনছেন যার জবাব দেয়া প্রয়োজন। এখানে আল্লাহ আপনার সাথে কথা বলছেন। সুতরাং এখন যেহেতু তুমি আমার সাথে কথা বলছো, আমাকেও তোমার সাথে কথা বলতে দাও। তুমি চাও যে আমি তোমার ডাকে সাড়া দেই, তাহলে তোমারও উচিত আমার ডাকে সাড়া দেয়া।

এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, কুরআন আসলে মূলত একজন প্রভু আর তাঁর দাসদের মাঝে কথোপকথন। দোয়া হলো যখন আমরা আল্লাহর সাথে কথা বলি, আর কুরআন হলো যখন আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন। বিষয়টা খুবই চমৎকার! এভাবেই একটি কথোপকথনের পূর্ণতা আসে। এক পক্ষ থেকে হলে হবে না। উভয় পক্ষ থেকে হতে হবে। আমাদেরকে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে হবে তাহলে আল্লাহও আমাদের ডাকে সাড়া দিবেন। وَلْيُؤْمِنُوا بِي – আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করতে থাকো। لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ – যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে।

এখন আমরা আমাদের জীবন ঠিক করার এক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান সম্পর্কে শিখছি। কিভাবে আমি আমার জীবন ঠিক করবো, আপনি কিভাবে আপনার জীবন ঠিক করবেন? উত্তর হলো – আল্লাহর সাথে সত্যিকার অর্থে কথোপকথনে মিলিত হওয়ার মাধ্যমে। আমি তাঁর সাথে কথা বলবো। আর তিনিও আমার সাথে কথা বলবেন। আমি তাঁর সাথে কথা বলবো আমার দোয়ার মাধ্যমে, আমার অনুরোধের মাধ্যমে, আমার মিনতির মাধ্যমে, তাঁর নিকট আমার অপরাধগুলো স্বীকার করার মাধ্যমে, আমার দুর্বলতার স্বীকৃতির মাধ্যমে, আমার প্রয়োজনগুলো তাঁর কাছে তুলে ধরার মাধ্যমে, আমার ভুলগুলো স্বীকার করার মাধ্যমে, আমি কেমন লজ্জিত তা ব্যক্ত করার মাধ্যমে, সামনে কিভাবে আমি আরো ভালো করবো তা উল্লেখ করার মাধ্যমে। আমি আশাবাদী যে যখন আমি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করবো, আমি তাঁকে হতাশ করবো না এবং আমি আরো আশাবাদী যে, তিনি আমার পাপগুলো ক্ষমা করে দিবেন। এর সবগুলোই তাঁর সাথে আমার আলাপ।

আর যখন তিনি আমার সাথে কথা বলেন….. প্রসঙ্গত তিনি শুধু আপনাকে আদেশ উপদেশ দান করেন না। তিনি আপনাকে আশা দেখান, তিনি আপনাকে কৃতজ্ঞ হতে শেখান, তিনি আপনাকে সচেতন এবং সতর্ক করেন। তিনি আপনাকে আপনার চার পাশের মানুষ সম্পর্কে সচেতন করেন এবং কিভাবে তাদের সাথে আচরণ করতে হবে তা শেখান। তিনি বাস্তবতা সম্পর্কে আপনার চোখ খুলে দেন। এই কথোপকথন জীবনকে সঠিক পথ দেখিয়ে দিবে।

অনেক মানুষের এমন হয়, যখন সে সমস্যায় পতিত হয় কারো সাথে কথা বলা তার জরুরি হয়ে পড়ে। এই আয়াতগুলো আমাদের বলছে যে, রমজানের এই ত্রিশ দিন হলো আল্লাহর সাথে কথা বলার মোক্ষম সময়। আল্লাহর সাথে আমাদের এই আলাপচারিতা করতে হবে। আপনি যদি এটা করতে পারেন …. আপনাদের কেউ কেউ হয়তো রাত্রিবেলা কাজ করেন, আপনার পক্ষে তারাবির নামাজে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নয়। কারো কারো অন্য কোনো সমস্যার কারণে হয়তো মসজিদে উপস্থিত হওয়া সম্ভব নয়। কারো কারো পরীক্ষা থাকতে পারে, এই সেমিস্টারে হয়তো অনেকগুলো কোর্স নিয়েছেন , তাই রমজানেও আপনি অনেক ব্যস্ত থাকবেন। আপনাদের কারো কারো জন্য সময়টা সহজ হবে না, ব্যস্ত থাকবেন।

আপনাদের মধ্যে যারা ইবাদাতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে পারবেন, সেটা তাদের জন্য চমৎকার। আর যারা পারবেন না, তারা আল্লাহর সাথে এই কথোপকথনের ধারণাটা উপলব্ধি করুন, তাহলে আপনি একটি সুন্দর রমজান অতিবাহিত করতে পারবেন। রামাদান শুধু মাত্র উপোষ থাকা নয়, বরং আল্লাহর দেখানো পদ্ধতিতে তাঁর সাথে আবার যোগাযোগ করা এবং তাঁর সাথে বন্ধন তৈরী করাও রমজানের উদ্দেশ্য।

আল্লাহ আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুক যারা তাঁর সাথে সরাসরি কথা বলেন, এবং আল্লাহ সুব হানাহু ওয়া তায়ালাও তাঁর বইয়ের মাধ্যমে যাদের সাথে কথা বলেন।

(Visited 35 times, 1 visits today)

মতামত

comments