প্রত্যাশার মাস রামাদান – প্রথম পর্ব

আজ আমি আপনাদের সাথে এই অসাধারণ মাসের কিছু ইতিহাস শেয়ার করতে চাই যে মাসটি আমরা প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ করবো বলে আশা করছি। আমি প্রথমেই আল্লাহর কাছে এই দোয়া করে শুরু করছি যে, আল্লাহ যেন আমাদেরকে এই আসন্ন মাস থেকে সর্বোচ্চ উপকার গ্রহণের তৌফিক দান করেন। এবং তিনি যেন এই মাসটিকে আমাদের সারা বছরের হেদায়েতের ও ক্ষমা পাওয়ার উৎসে পরিণত করেন। আর এর মাধ্যমে আমাদের অন্তর যেন আল্লাহর প্রতি আরো কোমল হয়ে উঠে এবং আমরা যেন একে অপরের প্রতি আরো সহনশীল হয়ে উঠতে পারি।

কুরআন মাজিদের একমাত্র সূরা যেখানে রামাদান সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে, সূরাতুল বাকারা, সেই সূরার কিছু অংশ আজ আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করতে চাই। রামাদানের আয়াতটি সূরা বাকারার যে অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, তা আসলে বেশ আগে থেকে চলে আসা একটি বক্তব্যের বর্ধিতাংশের অন্তর্ভুক্ত। এই বক্তব্যটি আসলে আদম আলাহিস সালামের আলোচনা দিয়ে শুরু হয়েছে।

আল্লাহর এই অসাধারণ সৃষ্টি আদম আলাইহিস সালাম…তিনি এমনকি ফেরেস্তাদের ও বলেছিলেন তাঁর এই বিস্ময়কর সৃষ্টিকে সেজদা করার জন্য। এই অসাধারণ সৃষ্টিকে জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সবকিছুর শেষে আমরা যেখানে ফেরত যেতে চাই। এই বিষয়টা উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আল্লাহ বলেছেন – أُولَٰئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ – الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ – “তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা শীতল ছায়াময় উদ্যানের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।”

উত্তরাধিকার মানে আপনার পূর্বপুরুষরা এটার মালিক ছিল। এটাই এর অর্থ। সেই জান্নাতের বাসস্থান আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম কে দেয়া হয়েছিল। সেখান থেকেই মানব জাতির যাত্রা শুরু। তাই আমরা যখন জান্নাতে ফেরত যাব আমরা আসলে সেটা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করবো। যা ইতিমধ্যে আমাদেরকেই দেয়ার কথা ছিল। আমরা সবাই জানি যে, দুনিয়াতে এক ধরণের কিছু অর্থ/সম্পদ আছে যা আপনাকে পরিশ্রম করে উপার্জন করতে হবে। আবার অন্য ধরণের কিছু অর্থ-সম্পদ আছে যা আমরা পারিবারিক সূত্রে পেয়ে থাকি। সেটা হতে পারে কোনো জায়গা-জমি, টাকা-পয়সা, গাড়ি বা স্বর্ণ-অলংকার যা আপনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন।

জান্নাতের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উভয় রকম। এটা আমাদের পিতাকে দেয়া হয়েছিল তাই এর উত্তরাধিকার আমরা পাবো। আবার একই সময়ে আমরা যদি এর জন্য পরিশ্রম না করি তাহলে পাবো না। এটা একই সময় উভয় রকম। যাইহোক, আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে এই অসাধারন উপহার দিয়েছিলেন। তিনি আদম আলাইহিস সালামের সাথে সরাসরি কথা বলতেন। তিনি তাকে সরাসরি উপদেশ দিতেন, মুক্তভাবে সেখান থেকে আহার করতে বলেছিলেন।

তিনি আমাদের মা এবং বাবাকে বলেছিলেন তারা এই জান্নাতে যা ইচ্ছা পেতে পারে। আমরা সবাই গল্পটি জানি। শুধু একটি গাছ ছাড়া। এই সকল উপদেশ দেয়ার মাঝে একটা বিষয়ে আমি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। আর তা হলো, আল্লাহ সরাসরি আদম আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন – اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ – “তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক।” আর জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন – عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ – “عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ” – “সিদরাতুলমুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত।” 

জান্নাতের অবস্থান অনেক উপরে। আর এই পৃথিবীকে আরবিতে বলা হয়ে ‘দুনিয়া’ – আর ‘দুনিয়া’ শব্দটি ‘আদনা’ শব্দের স্ত্রী বাচক রূপ। যার অর্থ নিচ, নিম্ন। অর্থাৎ এই দুনিয়ার জীবন হলো সবচেয়ে নিম্নমানের জীবন। এখান থেকে আপনি শুধু উপরের যেতে পারবেন। আর উপরে হলো জান্নাতের অবস্থান। জান্নাতের অবস্থান অনেক উঁচুতে। সূরা আন-নাজমে বলা হয়েছে এর অবস্থান আল্লাহর আরশের ঠিক নিচে। আল্লাহর আরশের নিকটে এর অবস্থান। আমি যা বলতে চাচ্ছি, আদম আলাইহিস সালাম যে শুধু সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলতেন তা নয়, তিনি আল্লাহর খুব নিকটেও ছিলেন। জান্নাতের নিয়ামত শুধু গাছপালা আর খাবার-দাবারের মাঝে সীমাবদ্ধ নয় বরং জান্নাতের এক অপার বিস্ময়কর নিয়ামত হলো আল্লাহ সুব হানাহু ওয়া তায়ালার সংস্পর্শ। এটি জান্নাতের সবচেয়ে অসাধারণ নিয়ামত।

তারপরেও আদম (আ) এক ভয়ঙ্কর ভুল করে ফেললেন। শয়তানের ওয়াসওসা সফল হলো। ভুল কাজটা ঘটে গেলো। অনেক মানুষ এখানে ভুল করে, তারা মনে করে যে এই কারণে আদম (আ) কে শাস্তি দেয়া হয়। আর শাস্তিটা ছিল জান্নাত থেকে তাঁকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। এভাবেই এই দুনিয়ায় মানব জাতির বসবাস শুরু; আদম (আ) কে শাস্তিস্বরূপ এখানে পাঠানোর ফলে।

আপনি যদি গভীর মনোযোগ দিয়ে কুরআনে এই বিষয়টা অধ্যয়ন করেন, তাহলে উপলব্ধি করবেন যে, না, আদম (আ) কে আসলে এখানে শাস্তিস্বরূপ পাঠানো হয়নি। এটা খ্রিস্টানদের দৃষ্টিভঙ্গি। খ্রিস্টানরা মনে করে যে, এই পৃথিবীর জীবন একটি অভিশপ্ত জীবন। এখানে মানুষ তার আদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে।

কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এটা নয়। আমাদের মত হলো – প্রতিটি মানুষ ফিতরাতের (ভাল প্রকৃতির) উপর জন্মগ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে, আদম (আ) এর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ এই দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে বলেন – وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ ۗ قَلِيلًا مَّا تَشْكُرُونَ – “আমি তোমাদের জন্য ওতে জীবিকা নির্বাহের উপকরণসমূহ সৃষ্টি করেছি, তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক।”

আল্লাহ এই দুনিয়াকে শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেননি। বরং তিনি এই পৃথিবীর জীবনকে সুন্দর উপভোগ্য এক জীবন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে আপনি যত বেশি কুরআন অধ্যয়ন করবেন, ততবেশি চারপাশের বিস্ময়কর সৃষ্টিকে মূল্যায়ন করতে পারবেন। তিনি বর্ণনা করেছেন – কিভাবে তিনি উট সৃষ্টি করেছেন, কেমন অপরূপ সুন্দর করে তিনি পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, আকাশ, গাছপালা, আমাদের খাবার-দাবার, এমনকি তিনি বর্ণনা করেছেন কেমন অনুপম রূপে তিনি ফলের উপর আবরণ সৃষ্টি করেছেন। অন্য কথায়, আল্লাহ এই পৃথিবীকে কুৎসিতরূপে সৃষ্টি করেন নি। তিনি এটাকে সুন্দরকরে সাজিয়েছেন। তিনি এখানে আমাদের জন্য জীবিকা নির্বাহের উপকরণ সৃষ্টি করেছেন যেন আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কুরআন মাজিদের অনেক জায়গায় আপনি শিখবেন যে, এই দুনিয়ার অসংখ্য নিয়ামতরাজি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হলো আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যে, যদি এই পৃথিবীর নিয়ামতরাজি এতো সুন্দর হয় তাহলে আমাদের আদি গৃহ জান্নাতের নিয়ামতরাজি না জানি কত সুন্দর ছিল!!

এটা আপনাকে জান্নাতের কথা স্মরণ করানোর কথা। এই পৃথিবী জান্নাতের একটি প্রিভিউ। যদিও জান্নাত কল্পনাতীত সুন্দর। কিন্তু কিছু কিছু বিষয় দুনিয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আল্লাহ জান্নাতের গাছপালার কথা বর্ণনা করেছেন। এখন আমি আপনি গাছপালা কিভাবে চিনবো যদি আল্লাহ দুনিয়াতে গাছপালা না দিতেন। তিনি জান্নাতের নদী, মধু, দুধ, পাখির গোশত সম্পর্কে কুরআনে বলেছেন। আপনি কখনো এই নিয়ামতগুলো কদর করতে পারতেন না, যদি এখানে তার কিছুটা স্বাদ না পেতেন। তাই এক দৃষ্টিতে বলা যায়, তিনি এই দুনিয়াকে জান্নাতের একটি প্রিভিউ হিসেবে তৈরী করেছেন।

যাইহোক, আমি আমার পূর্বের বক্তব্যে ফেরত আসছি। আদম (আ) আল্লাহর খুব নিকটে ছিলেন। এখন সেই ভুলের কারণে আল্লাহ তাঁকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। আবারো বলছি, আমরা এখন জানি এটা শাস্তি ছিল না। কিন্তু তবু এটাকে একটা শাস্তি মনে হয়। কারণ তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে এখানে পাঠিয়ে দেয়া হলো। জান্নাতের সবকিছু চিরস্থায়ী। আপনি বৃদ্ধ হয়ে পড়বেন না, অসুস্থ হবেন না, কোনো কিছুর ভয় নেই, কোনো দুঃখ নেই। আর এখানে? لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ – “নিশ্চয় আমি মানুষকে শ্রমনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।” মানুষ এখানে ক্ষুধার কষ্ট পাবে, অসুস্থ হবে, দুর্বল হবে, পরিশ্রম করতে হবে। কোনো সমস্যা ছাড়া থাকা যাবে না। এই পৃথিবী সমস্যায় পরিপূর্ন। এটাই এমনই। এই পৃথিবী সুন্দর হলেও আমাদের প্রত্যকেরই জীবনে কোন না কোন সমস্যা রয়েছে।

ইনশা’আল্লাহ চলবে…

(Visited 14 times, 1 visits today)

মতামত

comments