জীবনে কেন বিপদাপদ ঘটে? পর্বঃ ০২

জীবনে কেন বিপদাপদ ঘটে? পর্বঃ ০২

আমাদের মনে নানা ধরনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য আছে, যা আমরা মনে করি আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে। অথচ আল্লাহ বলেন, এর চেয়েও অনেক মূল্যবান কিছু তোমাদের মনে আছে, যদি তোমরা তা বাস্তবায়ন করতে পার- যদিও এর মূল্য তোমরা অনুধাবন করতে পার না, তবে আমি তোমাদের জানাচ্ছি এর মূল্য কতখানি! – এর মূল্য হলো এটা অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।

আর ঠিক এরপরেই, এই অভিনন্দন জানানোর পরই আল্লাহ পাক বলেন

الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُو
” যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।” (সূরা বাকারাঃ ১৫৬)

কোন ধৈর্যশীল ব্যক্তিদের জন্য এই অভিনন্দন? যখনই একটি নির্দিষ্ট বিপর্যয় তাদের আঘাত করে , যে কথাটি প্রথমেই তাদের মুখে চলে আসে –‘কালু’ (তারা বলে) , এমনকি ‘ফাক্বালু’ও (অতপর তারা বলে ) নয়। এমনকি ‘ছুম্মা ক্বালু’ ও (এরপর তারা বলে) নয়। আল্লাহ পাক বলছেন না যে, তখন তারা বলে। যদি এটা ঘটে বা যখন ঘটে তখন তারা বলে। বাক্যটিতে কোন “যদি” নেই, এমনকি “তখন” কথাটিও নেই। কেন নেই? কারণ এটা হতে হবে একটি তাৎক্ষণিক জবাব!

আমরা ফিজিক্স , মেডিসিন অথবা বায়োলজিতে পড়ে থাকতে পারি, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে। যখন একজন ডাক্তার আমাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে তখন সে হাটুতে হালকা আঘাত করে এবং হাটু তাৎক্ষণিকভাবেই একটু উপরে উঠে যায়। তারা এই রিফ্লেক্সগুলোকে পরীক্ষা করে। এই আয়াতটি আমাদের এটাই শিখাতে চাচ্ছে যে, যখন যাবতীয় বিপদ-আপদ আপনার আমার উপর আসবে, আমাদের একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত। প্রতিক্রিয়া কখনই দেরিতে হয়না, সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে যায়। কাউকে জোর করে করতে হয়না, এমনিতেই চলে আসে। আর কী চলে আসে ? “ইন্না লিল্লাহি” কোন সন্দেহ নেই, আমরা আল্লাহ্‌রই জন্য। “ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” এবং আমরা একমাত্র তার কাছেই ফিরে যাব। অর্থাৎ আমাদেরকে আমাদের মালিকের কাছেই ফিরিয়ে দেয়া হবে।

বিপর্যয়ের সময় এই আয়াতটি কেন গুরুত্বপূর্ণ ? আমাদেরকে এর হিকমা সম্পর্কে ভাবতে হবে যে যখনই কোন বিপদ আপদ আসে, কেন আমরা “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলব? যখন আপনি ফোনে কোন খারাপ খবর শুনলেন, কেন আপনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”? এখন প্রথমে বুঝতে চেষ্টা করুন যে, আপনি যদি এটা বলেন তাহলে কুরআন আপনার জন্য একটি পুরস্কার বরাদ্দ রেখেছে। কুরআনে আপনার জন্য একটি পুরস্কার রয়েছে। প্রথমে আমি আপনাদের সাথে সেই পুরস্কারটি শেয়ার করতে চাই। কি সেই পুরস্কার?

ঠিক আগের আয়াতটিতে আল্লাহ আদেশ করেছিলেন মুমিনদেরকে অভিনন্দন জানাতে। এখানে আদেশটি হলো : ‘আল আমর ফিল মুফরাদ’। এখানে বহুবচন وبشروا الصابرين বলা হয়নি বরং বলা হয়েছে وبشر الصابرين যা একবচন। এখানে আদেশটি একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। আর যখন আল্লাহ পাক শুধু একজনকে আদেশ করছেন, তখন এটি আমাদের নবী (সা) এর উপর সরাসরি আদেশ। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার নিজের মুখ থেকেই ধৈর্যশীলদের অভিনন্দন জানাবেন। আর এর পরের আয়াতটিতে তিনি বলছেন যে, যারা “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলছে বিপদের সময়ে (আল্লাহ পাক আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন), যখন আমরা কেয়ামতের দিনে দাঁড়িয়ে থাকব, আমরা যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হই যাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে অভিনন্দন জানাবেন! এই আয়াতটি এটাই বলছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তাদেরকে অভিনন্দন জানাবেন যারা এই কাজটি করবে। আর আমরা অবশ্যই তাঁর কাছে থেকে অভিনন্দন পেতে চাই। যখন আমাদের পরিবার আমাদের অভিনন্দন জানায় তখন আমাদের এক ধরনের অনুভূতি হয়, আবার যখন স্কুলের প্রিন্সিপাল অভিনন্দন জানায় তখন আমাদের ভিন্ন অনুভূতি হয়, যখন ভার্সিটির ডিন আমাদের অভ্যর্থনা জানায় তখন আবার অন্য রকম এক অনুভূতি।আর যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওই ধৈর্যশীলদের অভ্যর্থনা জানাবেন, আল্লাহ পাক তাঁকে আদেশ করেছেন তাদের অভিনন্দন জানাবার জন্য, আমরা অবশ্যই তাদের মাঝে একজন হতে চাই। এটাই সেই পুরস্কার।

এখন আমরা “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” এ ফিরে যাই। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। আমি জানি, আপনাদের কারও কারও সমস্যা হয়ত এর চেয়ে আরও অনেক অনেক বড়, এটা শুধু আমি একটি উদাহরণস্বরূপ দিচ্ছি আমার কল্পনা থেকে। আপনারা নিজেদের ব্যাপারেই ভাবুন এই উদাহরণ গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে। ধরুন আমি একটি প্রাইভেট কার ড্রাইভ করছি। একদম নতুন কেনা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই গাড়িতে কোন একটা সমস্যা দেখা গেল। বাধ্য হয়ে গাড়িটা সাইড করে রাস্তার পাশে রাখতে হল। প্রচন্ড রাগ হল আমার, অনেকগুলো টাকা দিয়ে গাড়িটা কিনলাম। কিভাবে হতে পারে এমন কিছু? জরুরি কাজটা আজ মিস হয়ে যাচ্ছে। এই গরমে জ্যামের মাঝে আটকে আছি, ওইদিকে এসিটাও ঠিকভাবে কাজ করছেনা। এই সবকিছু নিজের মনে ভাবছি।

কিন্তু একজন সত্যিকারের মুমিন হিসেবে যেটা ভাবা উচিত, তা হল “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”। কেন? কারণ আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, গাড়িটার উপর আমি বিরক্ত কারণ আমিই এটার মালিক। গাড়িটা আমারই। কিন্তু আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছি যে আমি আসলে কিছুরই মালিক নই, কোন কিছুই আমার সম্পদ নয়। বরং আমি নিজেই অন্য কারও সম্পত্তি। আমি একমাত্র আল্লাহর, তিনিই আমার মালিক। কোন সন্দেহ নেই, আমি তাঁরই জন্য। কিভাবে আমি তাহলে অভিযোগ করবো কিছুর ব্যাপারে? আমিতো কিছুরই মালিক নই!

মানুষ তখনই রেগে যায় যখন সে তার প্রাপ্য কিছু আশা করে, যখন আমার কিছু পাওয়ার কথা, পাওয়া উচিত। যখন আমাদের ফোন ঠিকভাবে কাজ করেনা, গাড়িটা ঠিকভাবে কাজ করেনা, লাইটটা অন হচ্ছে না। যখন প্রাপ্য কিছু আমরা না পাই, তখনই আমরা রেগে যাই। অথচ এই আয়াতটিতে আমরা বলি, “ইন্না লিল্লাহ”(আমরা আল্লাহর জন্য)। আমরা মেনে নেই, যে আসলে আমাদের প্রাপ্য বলতে কিছুই নেই। আমি তো আল্লাহরই জন্য, তিনি আমার মালিক। সবকিছু তাঁর প্রাপ্য, আমার নয়। এটি সব কিছুকে শান্ত করে দেয়। তখন এই দুনিয়ায় আমরা যাই পাই, সবকিছুই উপহারস্বরূপ। এমন কিছু নয় যা আমরা অর্জন করি , বরং উপহারমাত্র। আর যখন কিছু পাইনা, তখন বুঝতে পারি যে আরে এটাতো আমার প্রাপ্যই নয়।

আমরা আমাদের হাতকে খুব স্বাভাবিক কিছু বলে মনে করে নেই, আমাদের চোখকেও তেমনি স্বাভাবিক কিছুই মনে করি, আমাদের নাককেও খুব স্বাভাবিক কিছু মনে করি, আমাদের জিহবাকে খুব স্বাভাবিক কিছু মনে করি। আমি যে আপনাদের সামনে দাড়িয়ে কথা বলছি, আমি যে আপনাদের সাথে কথা বলতে পারছি এই সব কিছুকেই আমরা একদম স্বাভাবিক কিছুই মনে করি। কিন্তু এই জিহবার মালিক তো আমি নই। আমি তো কাউকে এই জন্য কোন টাকা দেইনি। একমাত্র আল্লাহ পাকই এটার মালিক। তাই যদি কখনও তোতলামি চলে আসে, “ইন্না লিল্লাহ”।

আর এই সমস্যাটার দ্বিতীয় অংশ, আল্লাহ পাক কিভাবে আমাদের ধর্মে সকল সমস্যার সমাধান দেন। কী জ্ঞানগর্ভ নির্দেশনাই না তিনি দান করেন!! যখন আমরা বিপদে পড়ি। দ্বিতীয় অংশ হল “ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”। কোন সন্দেহ নেই, তার কাছেই আমরা ফিরে যাব। কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আমি আপনি এই মুহূর্তে যেই বিপদেই থাকি না কেন, সেটা চিরস্থায়ী নয়! হোক সেটা টাকা পয়সার সমস্যা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পরিবার নিয়ে সমস্যা, ইমোশনাল সমস্যা, শারীরিক সমস্যা, যেটাই হোক। কোনটাই চিরস্থায়ী নয়। কারণ আমি,আপনি,আমরা নিজেরাই চিরস্থায়ী নই। যখন আমরাই স্থায়ী নই, তাহলে আমাদের সমস্যাগুলো কিভাবে স্থায়ী হবে? আমাদের নিজেদেরই আল্লাহ পাকের কাছে ফিরে যেতে হবে। এই সমস্যাটা কিছুই নয়, বরং ভুলে যান এটি, কারণ আমরাই তো থাকবনা। শুধু যে এই ঝামেলাগুলো থাকবে না তা নয়, আমরাই থাকব না। আমাদেরই ফিরে যেতে হবে আল্লাহ পাকের কাছে।

সবকিছু সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করুন । আর তখনই আপনি বুঝতে পারবেন আসলে আপনার কি নিয়ে চিন্তা করা উচিত। সার্বিক দিক থেকে সবকিছু বিচার না করলে যেকোন ভুল ব্যাপারে আপনি মনোনিবেশ করতে পারেন। আমার শিক্ষক সবসময় এই উদাহরণটি দিতেন যে, যদি কোন একটি বিল্ডিঙের ভিতরে থাকেন, যদি সেখানে আগুন লাগে, আর তখন আপনি কারও সাথে ঝগড়া করছেন কোন দেয়ালে কোন রঙ করা যায় তা নিয়ে?? ”আমার মনে হয় নীল রংটাই ভালো লাগছে।” জনাব! বিল্ডিঙে আগুন লেগেছে! আমাদের এখন সবার আগে পানি দরকার। আগুন নিভাতে হবে। এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।

যখন আমরা পুরো প্রেক্ষাপটটা বুঝব যে আরও বড় সমস্যা আছে। আর সেই সমস্যাটি হল যে আমরা এখনো মেনে নেইনি যে আমরা আল্লাহ পাকের জন্য। হয়তো কখনও কখনও আমি আপনি কোন সমস্যার মাঝে দিয়ে এইজন্যই যাই যাতে আল্লাহ পাক আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারেন যে আমি-আপনি- আমরা সবাই আল্লাহ পাকেরই জন্য। হয়তো আমি আপনি কোন বিপদের মাঝে দিয়ে যাচ্ছি এইজন্যই যে আল্লাহ পাক আমাদেরকে সেই পুরস্কারটি দিতে পারেন যে আমরা শুধু জিহবা দিয়ে বলব না বরং আমরা মন থেকেই বলতে পারব “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”। শুধু এটাই অনেক বড় এক পুরস্কার। এটা যদি আমরা মনে গেঁথে নিতে পারি, তবে ধৈর্য ধরা তখন সহজ হয়ে যায়। আর যদি আমি আপনি ধৈর্য ধরতে পারি, (আল্লাহ আমাদের ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন।) তবেই আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভ্যর্থনা পাব।

 

(ইন-শা-আল্লাহ চলবে)

 

 

(Visited 679 times, 1 visits today)

মতামত

comments