কুর’আনের ভাষাগত মু’জিযা (পর্ব ১) – শুয়াইব (আঃ)

কুর’আনের ভাষাগত মু’জিযা (পর্ব ১) – শুয়াইব (আঃ)

শুয়াইব (আঃ), আপনারা জানেন তিনি একজন নবী, ঠিক? এখন নবী (আঃ) হিসেবে তাঁর নাম কুর’আনে বহুবারে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ওয়া ইলয়া মাদিয়ানা আখা’খুম শুয়াইবা” মাদিয়ানের নিকট আমি প্রেরণ করেছিলাম তাদের ভাই শুয়াইবকে (আঃ)। এখন একটা কথা বলে রাখি, কোন জাতির কাছে শুয়াইব (আঃ) কে প্রেরণ করা হয়েছিল? মাদিয়ান.. ঠিক? এখন মাদিয়ান একই সাথে দুটি জিনিস কে বোঝায়, ঠিক আছে?

মাদিয়ান দুইটি অর্থ বহন করে। মাদিয়ান একই সাথে একটা জায়গার নাম আবার একই সাথে এটি একটি জাতির নাম। ঐ জাতিটিকে মাদিয়ান বলা হয়, আবার তাদের জায়গা কেও মাদিয়ান বলা হয়। এবং আল্লাহ বলেন মাদিয়ানের নিকট আমি প্রেরণ করেছিলাম তাদের ভাই শুয়াইবকে (আঃ)। সূরা শু’রায়, ২৬তম সূরা, আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিভিন্ন নবী-রাসূলদের ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “Idh qaala lahum akhuhum Lootun; idh qaala lahum akhuhum Saalihun; idh qaala lahum akhuhum Hoodun; idh qaala lahum akhuhum Noohun”- যখন তাদের ভাই নুহ (আঃ) কে তাদেরকে বললো। এর পরের বর্ণনায় আরেক নবীর কথা বলা হয়। যখন তাদের ভাই সালিহ (আঃ) কে বললো, তার নিজের জাতির কাছে। তারপর আসেন হুদ (আঃ)।

যখন তাদের ভাই হুদ (আঃ) তাদেরকে বললো। তারমানে সালিহ, হুদ, নুহ এবং লুত (আঃ) – চারজনের বেলায়ই বলা হলো তাদের ভাই, তাদের ভাই, তাদের ভাই। পঞ্চম স্থানে শুয়ায়ব (আঃ) এর কথা বলা হচ্ছে। আল্লাহ বলেন – যখন শুয়াইব তাদেরকে বললো। এখানে তিনি শুধু বললেন “ইয কালা লাহুম শুয়াইবুন” যখন শুয়াইব তাদেরকে বললো। একই সূরায় আগের সব নবীদের সাথে কী বলা হয়েছিল? তাদের ভাই নুহ, তাদের ভাই সালিহ, তাদের ভাই লুত, তাদের ভাই হুদ। কিন্তু যখন শুয়াইব (আঃ) এর কথা বলা হলো তখন বলা হলো শুধু শুয়াইব – এখানে ভাই কথাটির উল্লেখ নাই। আরো মজার ব্যাপার হলো কুর’আনের অনান্য জায়গায় আল্লাহ বলেন “ওয়া ইলাইয়া মাদিয়ানা” আগে যেভাবে বলা হয়েছে, “ওয়া ইলাইয়া মাদিয়ানা আখাহুম শুয়াইবা”। মাদিয়ানের কাছে, বিশেষ ভাবে, আমি তাদের ভাই শুয়াইবকে প্রেরণ করেছিলাম। যে সূরায় সবাইকে তাদের নিজ জাতির ভাই হিসেবে বলা হচ্ছে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই শুয়াইব (আঃ) এর ব্যাপারে আমরা কী দেখবো বলে আশা করা উচিত? তাদের ভাই।

কিন্তু “ভাই” শব্দটি এখানে বাদ দেয়া হলো। শুধু তাঁর বেলাতেই বাদ দেয়া হলো। আর বাকি সবার বেলায় থাকলো, আরো মজার ব্যাপার হলো এর একটু আগেই, মনে আছে? যে জাতির কাছে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল, তার নাম কি ছিল? মাদিয়ান। তাদের আরেকটি নাম ছিলো “আসহাবুল আইকা”। এটা একটু বড় নাম। “আস হাবুল আইকা” মানে হলো “আল-আইকার জাতি”। আইকা হলো একটা বিশাল গাছ, যেটা তারা পূজা করতো। সেই গাছটার নাম হলো আইকা। তাই তাদেরকে এই ধর্মীয় নামেও ডাকা হতো।

তাদের ধর্মীয় পরিচয় হলো আল-আইকার জাতি। ঘটনা হলো তিনি (শুয়াইব (আঃ)) মাদিয়ানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেটা মাদিয়ান শহরের ভেতরেই অবস্থিত এবং মাদিয়ান জাতির তত্ত্বাবধানেই ছিলেন, ঠিক? আরবদের একটা অংশ। তারমানে জাতিগত এবং স্থানগত দু’দিক থেকেই তিনি তাদের ভাই, তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি তাদের কাছে পাঠিয়েছিলাম তাদের ভাই শুয়াইবকে।

কিন্তু যখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মাদিয়ানের জাতি না বলে তাদেরকে আল-আইকার, সেই গাছের পরিচয়ে বর্ণনা করছেন, তারমানে আল্লাহ তায়ালা তখন তাদের ধর্মের ব্যাপারে কথা বলছেন, অর্থাৎ যখন তাদের ধর্মের ব্যাপার আসছে, তখন কি তিনি তাদের ভাই? না, অবশ্যই না। এজন্যে যখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের ধর্ম দিয়ে যখন বর্ণনা করেছেন আল্লাহ বলেন – যখন শুয়াইবকে তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিলো – কোনো ‘ভাই’ নেই। এই নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে, ‘ভাই’ শব্দটি বর্জন করে এখানে কী বোঝানো হয়েছে? বোঝানো হয়েছে যে, যখন কারো দ্বীন এর পার্থক্য থাকে তখন তাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ থাকতে পারে না, এটি চলে যায়। খুবই গভীর এবং নিখুঁত শব্দচয়ন। যে কারণে সূরা শু’রাতে একের পর এক “আখিহুম, আখিহুম, আখিহুম, আখিহুম” বলার পর হঠাত করে এক জায়গায় আর “আখিহুম” বলা হয়নি। নিখুঁত শুদ্ধতা এবং আপনারা দেখতে পেলেন কী জন্যে এটা করা হয়েছে। এটা ছিল প্রথম উদাহরণ।

(Visited 816 times, 1 visits today)

মতামত

comments