একটি সাংঘর্ষিক অনুভূতি

আমরা সবাই বলে থাকি, আমি জাহান্নামকে ভয় করি, আল্লাহকে ভয় করি। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে দেখুন মনে হয় যেন সবাই ছুটির দিন উদযাপন করছে। কোথায় সে ভয়, কোথায় সে আতঙ্ক? আপনার জীবনে কখনো, কোনো দিন কি এমন হয়েছে যে, আপনি সারা রাত ঘুমাতে পারেন নি – মুভি দেখে নয়, বা কোনো আড্ডা দিয়ে নয় – বরং জাহান্নামের ভয়ে আপনি সারা রাত ঘুমাতে পারেন নি।

আমি এমন মানুষের কথা জানি, যারা ঘুমাতে পারেন নি, কারণ পরের দিন সকালে তাদের পরীক্ষা ছিল। কেউ হয়তো ভালোবাসার কারণে ঘুমাতে পারেন নি। কোনো যুবক যদি প্রেমে পড়ে সে ঘুমাতে পারে না। আল্লাহর কসম! আমি মিথ্যা বলছি না। কোনো বোনও যদি এভাবে প্রেমে পড়ে ঘুমাতে পারে না। তারা সারা রাত মোবাইলে কথা বলে কাটিয়ে দেয়। যদি কথা না বলে তবুও একে অন্যের কথা মনে করে ঘুমাতে পারে না। কারো হয়তো কোর্টে হাজিরা দিতে হবে, তাই দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না।

সর্বশেষ কখন আপনার অন্তরে আল্লাহর ভয়ের কারণে সারা রাত ঘুমাতে পারেন নি। আপনি কি কখনো এমন কারো সাক্ষাৎ পেয়েছেন? যার মুখ মলিন হয়ে আছে, চোখ লাল হয়ে আছে – তারপর আপনি জিজ্ঞেস করলেন: “কী হয়েছে?” সে জবাব দিলো: “আল্লাহর কসম! ভাই আমি জাহান্নামের ভয়ে ভীত।” এটা শুনলে আপনি হয়তো হেসে দিতেন। সত্যিই! বেশি ওয়াজ শোনার কারণে মনে হয় তার এ অবস্থা হয়েছে। কেউ একজন তাকে সমুদ্র সৈকতে নিয়ে যাও। তাকে কিছু মজা করতে দাও।

আমাদের সময়ে জাহান্নামের ভয়ে ভীত হওয়া স্বাভাবিক নয়। আমাদের জীবনে সবকিছুকে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহর ভয় হয়ে পড়েছে অস্বাভাবিক। আর আজকে আমার আলোচনার উদ্দেশ্য এটাই। আমরা চাই মানুষ আল্লাহকে ভয় করুক। আমরা চাই মানুষ জাহান্নামের ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ুক। আল্লাহ বিশ্বাসীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন…. আপনাদের চোখ কান খোলা রেখে মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তিনি সুব হানাহু ওয়া তায়ালা ধার্মিক লোকদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন – وَالَّذِينَ هُم مِّنْ عَذَابِ رَبِّهِم مُّشْفِقُونَ – ”এবং যারা তাদের পালনকর্তার শাস্তি সম্পর্কে ভীত-কম্পিত।” আল্লাহ ঠিক তার পরবর্তী আয়াতে বলেন – إِنَّ عَذَابَ رَبِّهِمْ غَيْرُ مَأْمُونٍ – ”নিশ্চয় তাদের রবের আযাব থেকে কেউ নিরাপদ নয়।”

দুৰ্ভাগ্যবশতঃ আমি আপনি মনে মনে একটা উপসংহারে চলে এসেছি। জানেন সেই উপসংহারটি কী? আমার কোনো সমস্যা হবে না। সত্যিই? ভালোভাবে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন। ” আরে ভাই! কি যে বলেন! আমি জাহান্নামে যাবো? ভাই আমি নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, হজ্জে যাই, আমি যদি দোজখে যাই তাহলে বাকি সবার কী হবে। মানুষ ক্লাবে যায়, জিনা করে, মদ খায় আরো কত পাপ করে! আর আমি দোজখে যাবো!! আলহামদুলিল্লাহ! আমার সমস্যা হবে না।

এই রোগটি খুবই ভয়ংকর। কেন এই রোগটি ভয়ঙ্কর এবং সর্বত্র ছড়িয়ে আছে? আপনি যদি ভালোভাবে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করেন দেখবেন, আপনার একটি অংশ আপনার কোনো রকম শাস্তি হবে এ ব্যাপারে সন্দেহ করে। তাই আমরা যদি জাহান্নাম সম্পর্কে আলোচনা করি তবু তার কোনো প্রভাব আমাদের উপর পড়ে না। আরে! উনি তো কাফেরদের সম্পর্কে বলছেন। আমি ভালো আছি আমি এতো খারাপ না।

আমরা যদি আল্লাহর রাসূলের শ্রেষ্ঠতম সাহাবাদের দিকে তাকাই – হজরত আবু বকর, ওমর, ওসমান (রা) – যাদেরকে রাসূল (স) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আর তাই তাঁদের এখন এটা বিশ্বাস করতে হবে যে, তাঁদের কোনো শাস্তি হবে না। কিন্তু তারপরেও তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল। তারপরেও তারা রাত জেগে ইবাদাত করতেন। তারপরেও তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় পোষণ করতেন।

আবু বকর (রা) কে রাসূল (স) বলেন – “হে আবু বকর! জান্নাতের আটটি দরজা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশের আহবান জানাবে।” একবার ধারণা করুন, জান্নাতের আটটি দরজা আপনাকে জান্নাতে নেয়ার জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতা করছে। হযরত ওমর সম্পর্কে রাসূল (স) বলেন – হে ওমর! তুমি যখন কোনো পথ দিয়ে হাট, শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

আর হজরত ওসমানের নিকট রাসূল (স) তার দুই কন্যাকে বিয়ে দেন (একজনের মৃত্যুর পর অন্য জনকে)। একবার কল্পনা করুন, আল্লাহর রাসূল আপনার শ্বশুর। হজরত আলী (রাঃ) সহ এরকম দশ জন সাহাবীকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়। তারপরেও তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় ছিল।

এখন আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি, তাহলে কেন আমাদের এ ব্যাপারে কোনো উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নেই। তাহলে আমাদের অন্তরে কোনো ভয় নেই কেন? মানুষ চালাকি করে বলে, আমার আল্লাহর রহমতের উপর বিশ্বাস আছে। আমি আপনার মত নই। আমার আল্লাহর রহমত এবং দয়ার উপর বিশ্বাস আছে। আমি তাদের বলি – তাহলে আবু বকর ওমরের কী ছিল? আল্লাহর দয়ার উপর সন্দেহ?? না, এটা হতে পারে না।

আপনি যদি আসলেই ধার্মিক হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি তাদের পথে থাকবেন। আপনার অন্তর যদি প্রশান্ত হয়, তাহলে আপনার অন্তরেও তাদের মত সবসময় একটি সাংঘর্ষিক অনুভূতি বিরাজমান থাকবে। ভয় এবং আশা, ভয় এবং আশা। কিন্তু আমাদের আছে আশা, আশা, আশা এবং আশা। আল্লাহর ভয়? মাঝে মধ্যে আপনার অন্তরে অনুভূত হয়। কোনো লেকচার শুনলে হয়তো কিছুটা অনুভূত হয়। তারপর আবার মানুষের সাথে মিশলে তা হারিয়ে যায়। আমরা দিন রাত সারাক্ষন হাসি আনন্দে মেতে থাকি। অথচ আল্লাহ বলেন – أَفَمِنْ هَٰذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ – وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ – “তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসি- ঠাট্টা করছ! ক্রন্দন করছ না?” সত্যিকারের প্রশান্ত অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকতে হবে। আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে হবে। আমাদের এই অনুভূতিগুলো থাকতে হবে, এগুলো হলো সঠিক ঈমানের লক্ষণ।

— শায়েখ ওমর আল বান্না

(Visited 126 times, 1 visits today)

মতামত

comments